কৃষক-প্রজা পার্টি ১৯৩৭ সালের নির্বাচন ও হক মন্ত্রিসভা

শেরে বাংলা এ.কে.ফজলুল হকের কর্মজীবন : 

বাংলার অন্যতম কৃতিসন্তান শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বরিশাল জেলার সাতুরিয়া গ্রামে তার মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন । তার পিতা কাজী মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ছিলেন একজন আইনজীবী । বরিশালে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন । সেখান থেকে তিনি অতি কৃতিত্বের সাথে এফ.এ. পান করেন । পরবর্তীকালে এই প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকেই একসঙ্গে তিনটি বিষয়ে ( রসায়ন,পদার্থ ও অংক ) অবতীর্ণ হন এবং সাফল্যজনকভাবে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে অবাক করে দেন।  

১৮৯৫ সালে মাত্র ছয় মাসের প্রস্তুতিতে তিনি অংক শাস্ত্রের মাস্টার ডিগ্রী লাভ করেন । ১৮৯৭ সালে তিনি আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে শিক্ষানবীস শুরু করেন । ১৯০০ সালে তিনি স্বাধীনভাবে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন । পরবর্তীকালে তিনি আইন ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি গ্রহণ করেন । সরকারি চাকরি তার ব্যক্তিত্ব ও আদর্শের পরিপন্থী হওয়ায় তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি । ১৯১১ সালে তিনি সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে আবার হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন । আইন ব্যবসায়ে তিনি অসাধারণ সাফল্যের পরিচয় দেন । তার বাচনভঙ্গি , তেজশ্রী কণ্ঠ ও জোরালো যুক্তি আদালতকে তাকে এক বিশিষ্ট স্থান করে দিয়েছিল । 

১৯১১ সালে আইন ব্যবসার সাথে সাথে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন । অতি অল্প দিনের মধ্যে তিনি রাজনীতির অঙ্গনে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত হন এবং ১৯১৩ সালে তৎকালীন বাংলা ও ভারতীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন । ১৯১৮ সালে তিনি মুসলিম লীগের সভাপতির পদ অলংকৃত করেন । ১৯৩৭ সালে তিনি প্রথম অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন । ১৯৪০ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক অধিবেশনে তিনি পাকিস্তান প্রস্তাব পেশ করেন । পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৫৪ সালের প্রদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের অন্যতম নেতা হিসেবে তিনি পুনরায় রাজনীতিতে অবতীর্ণ হন এবং নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটে।  নির্বাচনের পর তিনি পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন । কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের জালে তিনি আটকা পড়েন।  তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় । অবশ্যই এর পরেও তিনি পূর্ব বাংলার গভর্নর পদে অধিষ্ঠিত হন । অবশেষে সুদীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী কর্মময় জীবনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন । 

কৃষক প্রজা পার্টি গঠন : 

১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদারগণ জমির মালিক হন । জমিতে প্রজাদের কোন স্বত্ব ছিল না । প্রজাদের সম্পূর্ণরূপে জমিদারের দয়ার উপর ছেড়ে দেওয়া হয় । জমিদার প্রজাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত খাজনা আদায় করলেও এবং তাদেরকে জমি থেকে উচ্ছেদ করলেও তারা কোনো প্রতিকার পেত না । চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের শর্ত অনুযায়ী প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা ও অন্যান্য কর বাবদ মোট ১৩ কোটি টাকা আদায় করার কথা থাকলেও জমিদারগণ অন্যায় ভাবে ১৩ কোটির অনেক বেশি আদায় করত । হাজার 900 জানে জানা যায় জমিদারগণ তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা আদায় করত এবং তা থেকে মাত্র  ৬ কোটি টাকা সরকারকে রাজস্ব দিত । জমিদারের অতিরক্ত খাজনা ও করের ভারে জর্জরিত প্রজারা উপায়হীন হয়ে  মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা ধার নিতে বাধ্য হতো । ফলে একদিকে জমিদার এবং অন্যদিকে মহাজন নিষ্পেষণে প্রজারা দুর্দশা চরমে পৌঁছে । দুর্দশাগ্রস্ত কৃষকেরা জমিদারদের দেীরাত্ন্য থেকে মুক্তি পাবার জন্য কখনো কখনো আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ।ঊনিশ শতকে  হাজী শরীয়ত উল্লাহ , দুদুমিয়া ও তিতুমীরের নেতৃত্বে জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রজাদের রক্ষার জন্যই কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল ।  ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পরে ইংরেজ সরকার জমিদারদের স্বেচ্ছাচারিতা থেকে তাদের রক্ষা করবার জন্য ১৮৫৯ সালে বঙ্গীয় ভূমিকার আইন পাস করেছিল।  এই আইনের জমিদারদের অতিরক্ত করে বিরুদ্ধে প্রজাদেরকে আদালতে আশ্রয় গ্রহণের অধিকার দেওয়া হয়েছিল । কিন্তু দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের পক্ষে ব্যয়বহুল আদালতের আশ্রয় গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না । বস্তুত এই আইনের দ্বারা প্রজাদের কোন উপকার হয় নি। 

কৃষক ও সাধারণ জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য কংগ্রেস মুসলিম লীগের কোন কর্মসূচি ছিল না।  মুসলিম লীগ কার্যত জমিদার শ্রেণীর অভিজাতদের হাতে ছিল এবং তারাই মুসলিম রাজনীতির কার্যক্রম নির্ধারণ করতেন।  তখন বাংলার অধিকাংশ কৃষক ছিল মুসলিম সম্প্রদায় ভুক্ত এবং অধিকাংশ জমিদার ছিলেন হিন্দু । এমত অবস্থায় কৃষক ও সাধারন জনগনের অধিকাংশ বিষয়ের প্রতিনিধিত্ব করবার জন্য নজরদারী নেতার প্রয়োজন ছিল। তখন বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে আর্বিভাব ঘটে এ. কে শেরে বাংলা ফজলুল হকের  । গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষকে তিনি অন্তর দিয়ে ভালোবাসতেন । ১৯১৩ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদের নির্বাচনী এক বক্ততায় তিনি নিজেকে , কৃষক, শ্রমিক ও জনসাধারণের প্রতিনিধি বলে ঘোষণা করেন এবং বলেন যে , তাদের অধিকার আদায়ের জন্য সারা জীবন সংগ্রাম করবেন । ফজলুল হক দূরদৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন যে , কৃষক সমাজের বাঘের উন্নতি সারা বাংলার উন্নতি সম্ভব নয়  । 

কৃষকদের অর্থনৈতিক মুক্তির মাঝেই তিনি দেখতে পান বাংলার অর্থনৈতিক মুক্তি । তাই অবহেলিত দুর্দশাগ্রস্ত ও নির্যাতিত কৃষকদের রাজনৈতিক দিক থেকে সচেতন করে তোলার জন্য ১৯১৫ সালে বাখেরগঞ্জে “ নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি “  গঠন করে কৃষক প্রজার স্বার্থ আদায়ের জন্য এক শক্তিশালী আন্দোলনের সূচনা করেন । এ আন্দোলন ইতিহাসে কৃষক প্রজা আন্দোলন নামে পরিচিত । 

প্রজা আন্দোলন অচিরেই গণআন্দোলনের পরিণত হয় । ১৯২৪ সালে ঢাকায় প্রজা সম্মেলনের অধিবেশন শুরু হয় । এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক । সভাপতি ভাষণে ফজলুল হক বলেন , “ বিধাতা আমাদের হাতে সম্মানজনক লাঙ্গন দিয়েছিল । আমরা লঙ্ঘনের ফাল দিয়ে এরূপ দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে জমি চাষ করব যাতে এ কর্তিত জমির উপর আমরা জাতীয় পুনঃজাগরণের বীজ রোপন করতে পারি ।” তিনি প্রজাদেরকে তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার উপদেশ দেন । 

১৯২৭ সালে ফজলুল হক মানিকগঞ্জে নির্বাচন কেন্দ্রে হতে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন । তার অদম্য চেষ্টায় বঙ্গীয় আইন পরিষদ  ১৯২৮ সালে “ বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব “ আইন পাশ হয় । কিন্তু আইনসভায় অধিকাংশ সদস্য জমিদার শ্রেণীর হওয়ায় তাদের কারসাজিতে এ আইনে কৃষক প্রজার সার্থক ভয়ানকভাবে উপেক্ষিত হয়।  ভারতীয় কংগ্রেস ও এ আইনের বিরোধিতা করে । তবে এ আইনের বলে প্রজাগণ কিছু অধিকার লাভ করেছিল । ১৯২৯ সালে মুসলমান নেতাগণ কলকাতার এক বৈঠকে নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির ব্যাপকভাবে গঠন করেন । স্যার আব্দুর রহিম সমিতির সভাপতি এবং মাওলানা আকরাম খাঁ এর কর্মসূচি নির্বাচিত হন।  শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক , মুজিবুর রহমান , আব্দুল করিম প্রমুখ এই সমিতির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।  এ সময় বাংলায় মুসলিম লীগ উপযুক্ত নেতার অভাবে মৃতপ্রায় ছিল । স্যার আব্দুর রহিমের গতিশীল নেতৃত্বে ক্রমেই “ নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি “ বাংলায় মুসলমানদের একমাত্র সক্রিয় ও শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান পরিণত হয় । 

১৯৩৫ সালে স্যার আব্দুর রহিম কেন্দ্রীয় আইন সভায় সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় তিনি প্রজা সমিতির পদে ইস্তফা দেন এবং শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক সর্বসম্মতিক্রমে প্রজা সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন । ফজলুল হক পরপর কুষ্টিয়া, ময়মনসিং এবং কয়েকটি জায়গায় প্রজা সমিতি কর্তৃক আয়োজিত সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন । এসব সম্মেলনে ফজলুল হক আবেগময় ভাষায় বাংলার কৃষক প্রজাদের সুখ-দুঃখের কথা বলেন এবং জমিদারদের বিরুদ্ধে বিষেদাগার করেন । ফলে অচিরেই ফজলুল হকের গতিশীল নেতৃত্বে আন্দোলন এক গণ আন্দোলনে রূপ নেয় এবং ফজলুল হক বাংলার প্রজাসাধারণের অসাংবাদিক নেতায় পরিণত হন।  

১৯৩৬ সালের এপ্রিল মাসে ফজলুল হকের সভাপতিত্বে ঢাকায় নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় । এই অধিবেশনে শ্রমিকের একদল সদস্য দাবি উত্থাপন করেন যে , প্রকৃত কৃষকদের এই সমিতির সদস্য করা উচিত এবং নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির নাম পরিবর্তন করে কৃষক প্রজা পার্টি রাখতে হবে । সেই অনুযায়ী প্রস্তাব পাস হয় এবং সমিতির নাম “ কৃষক প্রজা পার্টি “ রাখা হয় । অধিবেশনে ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিতব্য প্রদেশিক নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সমিতির পক্ষ হতে “ প্রজা সমিতির ১৪ দফা ” নামক এক কর্মসূচি প্রকাশিত হয়।  

এই কর্মসূচির বিষয়গুলো ছিল : 

১) বিনা ক্ষতিপূরণের জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ করা হবে ; 

২) কৃষককে জমিতে একচ্ছত্র মালিকানা প্রদান করা হবে ; 

৩) সাধারণ আবওয়াব ( অবৈধ আদায় ) বাতিল করা হবে ; 

৪) খাজনার হার কমাতে হবে ; 

৫) ঋণ সালিশী বোর্ড গঠন করে মহাজন শৃঙ্খলা থেকে কৃষক শ্রেণীর মুক্ত করতে হবে ; 

৬) কৃষকদের মধ্যে সুদ মুক্ত ঋণ বিতরণ করা হবে ;

৭) পাটের সর্বনিম্ন মূল্য ধার্য করা হবে ; 

৮) দেশব্যাপী খাল খনন করে সেচ ব্যবস্থার সুবিধা সৃষ্টি করতে হবে ; 

৯) নদ-নদী , খাল-বিল থেকে কচুরিপানা পরিষ্কার করে নৌ চলাচল সচল করা হবে ; 

১০) বিনা বেতনে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হবে ; 

১১) প্রতি থানায় একটি করে হাসপাতাল স্থাপন করা হবে ; 

১২) স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হবে; 

১৩) প্রশাসনিক ব্যয় কমাতে হবে; 

১৪) মন্ত্রীদের মাসিক বেতন ১,০০০ টাকা ধার্য করা হবে। 

প্রজা  সমিতির নতুন নামকরণ এর পর কৃষক প্রজা পার্টির জমিদার তালুকদার সভ্যগণ পার্টিতে প্রগতিপন্থীদের প্রভাব বৃদ্ধির কারণে দল ত্যাগ করেন ।  কিন্তু শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক নিজে একজন তালুকদার হওয়া সত্ত্বেও কৃষকরা তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখেন এবং প্রজাদের ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করবার জন্য কৃষক প্রজা পার্টির প্রার্থীরুপে ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে নামার সংকল্প করেন । 

মুসলিম লীগের পুনরুজ্জীবন : 

১৯০৬ সালে ঢাকায় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় । কিন্তু সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের শাখা হিসেবে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ১৯০৭ সালে কলকাতায় স্থাপিত হয় । বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন নবাব সলিমুল্লাহ এবং বিচারপতি জাহিদ হোসেন ও নওয়াব আলী চৌধুরী যুগ্ম-মহাসচিব হন । ১৯৩৫ সালে ভারতের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও মুসলিম লীগ কার্যত অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছিল । ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিতব্য প্রাদেশিক নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সাংগঠনিক শক্তি লীগের ছিল না । এমত অবস্থায় কলকাতা অভিজাত মুসলিম নেতৃবৃন্দ মিলিত হয়ে ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য “ ইউনাইটেড মুসলিম দল “ গঠন করেন । নবাব হাবিবুল্লাহ এই দলের নেতা নির্বাচিত হন । শহীদ সোহরাওয়ার্দী এই দলে যোগদান করলে দলটি শক্তিশালী হয়ে ওঠে । সোহরাওয়ার্দী ভিলেন এই দলের প্রাণস্বরূপ।  তিনি সকল বিবদমান মুসলিম দলগুলোকে নিজেদের আত্মকলহ ভুলে এই দলে যোগদানের আহ্বান জানান । এই দল কৃষক প্রজা পার্টির সঙ্গেও আপস করতে প্রস্তুত ছিল । কিন্তু দলে নেতা নির্বাচনের প্রশ্নে উভয়ের মধ্যে আলোচনা ব্যর্থ হয় । 

১৯৩৪ সালের শেষের দিকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ লন্ডন থেকে ভারতে ফিরে আসেন । অল্প দিনের মধ্যেই তিনি মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন । এরপর তিনি নির্জীব মুসলিম লীগের পুনরুজ্জীবন করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন । নির্বাচন উপলক্ষে নির্বাচনী সংস্থা গঠনের প্রচেষ্টায় তিনি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে সফর শুরু করেন । এ সময় জিন্নাহ  নিউ মুসলিম পার্টির নেতা হাসান ইস্পাহানীর আমন্ত্রণে কলকাতা সফরে আসেন । বাংলায় মুসলিম নেতাদের সঙ্গে তিনি খোলাখুলি আলোচনা করেন । তিনি কৃষক প্রজা পার্টিকে মুসলিম লীগের প্রার্থীরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আহ্বান জানান । তিনি মুসলিমলীগ কে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে নতুন গঠনতন্ত্র রচনা করেন । জিন্নাহর উপদেশ মতে ইউনাইটেড মুসলিম দল মুসলিম লীগের সাথে আপোষ করে ” মুসলিম লীগে পরিণত হয় । ফজলুল হক ব্যক্তিগতভাবে পুনরুজ্জীবিত মুসলিম লীগে যোগদানের পক্ষপাতী ছিলেন । কিন্তু প্রদেশিক মুসলিম লীগে অভিজাত ও শহরে রাজনীতিবিদদের ভিড় দেখে তিনি লীগে যোগদান না করে কৃষক প্রজা পার্টির মাধ্যমে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । 

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অক্লান্ত পরিশ্রমে ও সাংগঠনিক প্রতিভাবলে মুসলিম লীগ অল্পদিনের মধ্যে বাংলায় এক শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত হয় । এরমধ্যে ফুটবল মাঠে কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পরপর কয়েক বছর জয়লাভ এবং ১৯৩৬ সালে কলকাতা থেকে মুসলমানদের বাংলা মুখপাত্র “ দৈনিক আজাদ” প্রকাশিত হওয়ায় বাংলায় মুসলমান জনগণের মধ্যে নতুন উৎসাহ-উদ্দীপনার সঞ্চার হয় । 

১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের ফলাফল : 

১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী ১৯৩৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতে  ১১ টি পথ দেশের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । এই নির্বাচনে হিন্দুরা সমবেত কংগ্রেসের পতাকাতলে সমবেত হয় । কিন্তু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোতে মুসলিম লীগ ছাড়াও একাধিক মুসলিম দল ও গ্রুপ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে । ফলে নির্বাচনে মুসলিম লীগ ভালো ফল লাভ করতে পারেনি । কংগ্রেস এ নির্বাচনে ভারতের ১১টি প্রদেশের মধ্যে ৭ টি প্রদেশে বিরাট সাফল্য লাভ করে । প্রদেশগুলো হচ্ছে – মাদ্রাজ , মধ্যপ্রদেশ বিহার , উড়িষ্যা , বোম্বাই ও মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ । মুসলিম লীগ সংরক্ষিত মুসলিম আসনেও সফলতা লাভ করতে ব্যর্থ হয়।  

অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লীগ ও  শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় । এ নির্বাচনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে প্রাদেশিক মুসলিম লীগ মোটামুটি ভালই করে । ১১৮ টি সংরক্ষিত মুসলিম আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ  ৩৯ টি, কৃষক প্রজা পার্টি ৩৬ টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৪৩ টি আসন পায় । বাংলায় প্রদেশিক আইনসভায় মোট আসন সংখ্যা ছিল  ২৫০ টি । সাধারণ আসন গুলোর মধ্যে কংগ্রেস ৬০ টি আসন পায় এবং বাকী আসনগুলোতে  স্বতন্ত্র বর্ণ হিন্দু , তফসিলী হিন্দু ও ইউরোপীয় প্রার্থীদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায় । পটুয়াখালী কেন্দ্র থেকে ফজলুল হক মুসলিম লীগ প্রার্থী খাজা নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বিপুল ভোটে জয়লাভ করে । নাজিমউদ্দিনের এ পরাজয় গ্রামবাংলায় ফজলুল হকের জনপ্রিয়তার কথা প্রমাণ করে । নির্বাচনের পর স্বতন্ত্র মুসলিম প্রার্থীদের কেউ কেউ মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টি তে যোগ দেয় । এর ফলে বঙ্গীয় আইন সবাই মুসলিম লীগের সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৯ জন এবং কৃষক প্রজা পার্টির সদস্য সংখ্যা হয়  ৫৫ জন । 

অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে । পাঞ্জাবে  ১৭৫ টি আসনের মধ্যে লীগ জয়লাভ করে মাত্র ২টি আসন । উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সর্বমোট  ৫০ টি আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ কোন আসন পাইনি। এই প্রদেশের লালা কোর্তা দল প্রায় সব আসনে জয়লাভ করে । আসাম প্রদেশ কংগ্রেস অধিকাংশ আসনে জয়লাভ করে । এখানে লীগ মাত্র ৯ টি আসন পায় । হিন্দু প্রধান প্রদেশে কংগ্রেস একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার করে । সমগ্র ভারতবর্ষের ৮০৮ টি হিন্দু আসনের মধ্যে কংগ্রেস লাভ করে ৭১১ টি আসুন । সুতরাং  ১৯৩৭ সালের ভারতের প্রাদেশিক নির্বাচনে লীগের করুণ চিত্র ফুটে উঠে । সর্বমোট ৪৮২ টি মুসলিম আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ মাত্র ১০৬ টি আসনে জয়লাভ করে  । 

ফজলুল হকের প্রথম মন্ত্রিসভা ( ১৯৩৭-১৯৪১): 

১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কোন দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ( ১১২ টি আসন ) লাভ করতে পারেনি । নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর ২০ জন স্বতন্ত্র মুসলিম সদস্য মুসলিম লীগে এবং  ১৯ জন কৃষক প্রজা পার্টিতে যোগদান করেন । এর ফলে আইনসভায় মুসলিম লীগের সদস্য সংখ্যা হয় ৫৯ জন এবং কৃষক প্রজা পার্টিতে হয় ৫৫ । এই আইন সভায় কংগ্রেস  ৬০ টি আসন লাভ করে । এ অবস্থায় মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে সমস্যা দেখা দেয় । ফজলুল হক কংগ্রেস নেতা শরৎ বসুকে নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করেন । কংগ্রেস এ  সময় রাজবন্দিদের মুক্তি দাবি করলেও ফজলুল হক তা অস্বীকার করেন । এদিকে মুসলিম লীগ প্রজা-কংগ্রেস কোয়ালিশনের আশঙ্কায় তাড়াতাড়ি সোহরাওয়ার্দীর মাধ্যমে ফজলুল হকের সঙ্গে আপোষ করে । এর ফলে গঠিত হয় ফজলুল হকের নেতৃত্বে প্রজা পার্টির কোয়ালিশন সরকার । এটিই বাংলার প্রথম হক মন্ত্রিসভা । 

প্রথম হক মন্ত্রিসভায় ১১ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয়।  এই  ১১ জনের মধ্যে ৬ জন ছিলেন মুসলমান ও  ৫ জন হিন্দু । মুসলমান ৬ জনের মধ্যে কৃষক প্রজা ২ জন , মুসলিম লীগ ৪ জন । ৫ জান হিন্দুর মধ্যে বর্ণহিন্দু ৩ জন এবং তফসিলী হিন্দু  ২ জন । লীগের পক্ষ থেকে নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ , হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী , খাজা নাজিমুদ্দিন ও নবাব মোশারফ হোসেন এবং কৃষক প্রজা পার্টি থেকে এ.কে ফজলুল হক ( মুখ্যমন্ত্রী ) ও সৈয়দ নওশের আলি মন্ত্রী হন । বর্ণহিন্দুদের পক্ষ থেকে  নলিনি রঞ্জন সরকার, স্যার বিজয় প্রসাদ সিংহ রায় ও কাশিম বাজারের মহারাজা শ্রীশচন্দ্র নন্দী এবং তফসিলী হিন্দুদের পক্ষে  মুকুন্দ বিহারী মল্লিক ও প্রসন্ন দেব রায়কুত মন্ত্রী হন । 

ফজলুল হক বাংলার কৃষক প্রজাদের উন্নতিকল্পে নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন । ১৯৩৮ সালে তিনি প্রজাস্বত্ব আইনের আমুল সংশোধন করেন।  এর ফলে জমিদারদের দাঁড়াব ফজার উপর খাজনা বৃদ্ধির দশ  বছরের জন্য স্থগিত করা হয়  । বকেয়া খাজনার  উপর ধার্যকৃত সুদের হার ১২.৫% থেকে কমিয়ে ৬.২৫ % ধার্য করা হয় । প্রজার কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ আদায় ( আবওয়াব ) বাতিল করা হয় । সংশোধনী আইনের ফলে জমির উপর মালিকানা স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।  ঋণের মরণ ফাঁদ থেকে কৃষকদের উদ্ধারের উদ্দেশ্যে ফজলুল হক সরকার বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের ঋণ সালিশী বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেন । এসব বোর্ড সুদ রহিত করে কেবল আসল টাকা পরিশোধের মাধ্যমে চাষের জমি ফিরে পাওয়ার ব্যবস্থা করেন । ১৯৪০ সালে ‘মহাজনী আইন’ ( মানি লেন্ডার্স এ্যাক্ট , ১৯৪০ ) পাস হয় । এই আইন অনুযায়ী সরকার মহাজনদেরকে ( সুদের ব্যবসায়ীদেরকে ) সরকারি দপ্তরের নাম নথিভুক্ত করে ‘ ট্রেডিং লাইসেন্স “ নেওয়ার নির্দেশ দেন । এই আইন দ্বারা সুদের হার ৬% থেকে ৮% এর মধ্যে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় । এই আইনের ফলে মহাজনের শোষণের মাত্রা অনেকখানি কমে যায় । 

ফজলুল হক তাঁর নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জমিদারদের নিয়ে গঠিত সরকার দিয়ে জমিদার প্রথা তার পক্ষে উচ্ছেদ করা কঠিন ছিল । এজন্য  ১৯৩৮ সালে স্যার ফ্রান্সিস ফ্লাউডের নেতৃত্বে একটি ভূমি রাজস্ব গঠন করেন । উক্ত কমিশন ১৯৪০ সালে পেশকৃত রিপোর্টে ক্ষতিপূরণ প্রদান সাপেক্ষে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের সুপারিশ করে । কিন্তু ভূমি সংস্কারের বিরুদ্ধে জমিদারদের চাপ এবং ১৯৪১ সালে সরকারের পরিবর্তনের ফলে ফ্লাউড কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি । এই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী  ১৯৫১ সালে পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগ সরকার ‘ পূর্ব বাংলা জমিদারি দখল আইন ‘ ( East Bengal Zamindari Acquisition Bill, 1951 ) পাস করেন । আর এই জন্যই জমিদারি প্রথার অবসান ঘটে । 

কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে ফজলুল হক সরকার “ ঢাকায় এগ্রিকালচারাল স্কুল” কোন গঠন করেন এবং রাজশাহীতে  ‘ বসন্তকুমারী এগ্রিকালচার ইন্সটিটিউটকে ’ আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেন । উচ্চতর কৃষি শিক্ষা লাভের জন্য লন্ডনে  ৩টি স্কলার্শিপ ব্যবস্থা করা হয় । তাছাড়াও কৃষি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে শ্রেষ্ঠ কৃষকদের নগদ মূল্য পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হয় । কৃষকদের হাঁস-মুরগি পালন , ফসলের চাষ ও গো-পালন ইত্যাদি কাজে উৎসাহ প্রদান করা হয় । চাষের সুবিধা প্রসারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন নদী ও খাল সংস্কারের জলাশয়গুলো কচুরিপানা মুক্ত করার জন্য ব্যাপক প্রচার অভিযান শুরু করা হয় । 

শিক্ষার উন্নতির জন্য ফজলুল হক সরকার নানাবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন । তিনি প্রাথমিক শিক্ষার  অবৈতনিক করার পক্ষপাতী ছিলেন । কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি ‘ শিক্ষা কর ’ চালু করে এই সমস্যা মেটাতে সচেষ্ট হন । নারী প্রসারের জন্য ফজলুল হক বিভিন্ন স্কুলে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেন । মুসলমান মেয়েদের শিক্ষালাভের সুবিধার্থে তিনি কলকাতায় ‘ লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন । কলেজে মেয়েদের আবাসন সুবিধা জন্য একটি ছাত্রী হোস্টেল নির্মাণ করা হয় । মুসলিম মেয়েদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের উৎসাহ দেওয়ার জন্য নয়টি স্কলারশিপের ব্যবস্থা করা হয় । ফজলুল হকের এইসব ব্যবস্থার ফলে মুসলমানদের মনে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে এবং বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার তারা গর্ব অনুভব করে । 

কিন্তু কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি । কংগ্রেস সদস্য শুরু থেকে ফজলুল হকের বিরোধিতা করেন । ফলে প্রাথমিকভাবে তিনি মুসলমানদের স্বপক্ষে বিভিন্ন কার্যক্রম ও বক্তব্যের ফলে তাদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন । কিন্তু লীগের চাপে পড়ে তিনি তার মন্ত্রিসভায় কৃষক-প্রজা সদস্য শামসুদ্দিন আহমেদকে বাদ দিয়ে জমিদার শ্রেণীর মোশারফ হোসেনকে মন্ত্রিসভা গঠন করলে তার নিজের দলের মধ্যে ভাঙ্গন দেখা দেয় । তিনি আইন সভায় কৃষক-প্রজা দলের সদস্যদের এক সভায় করে ১৭ জন সদস্যকে বহিষ্কার করেন । এর ফলে বঙ্গীয় আইন সভায় লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যায় । ইতিমধ্যে কলকাতা অবাঙালি মুসলিম শ্রেণীর তার বিরুদ্ধে চলে যায় এবং খাজা নাজিম উদ্দিনকে মুখ্যমন্ত্রীর জন্য চাপ শুরু করেন । এভাবে ক্রমাগত তিনি লীগ, কংগ্রেস এবং দলত্যাগী কৃষক প্রজা পার্টির সদস্যদের আক্রমণের মুখে পড়েন । শেষ পর্যন্ত ১৯৩৭ সালের অক্টোবর মাসে ফজলুল হক কৃষক প্রজা পার্টির ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগদান করেন । তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন । 

শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হকের মুসলিম লীগে যোগদান বঙ্গীয় মুসলিম লীগের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা । ফজলুল হকের যোগ্য নেতৃত্ব এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাংগঠনিক প্রতিবার ফলে অচিরেই মুসলিম লীগ বাংলার চরম জনপ্রিয়তা লাভ করে । হক মন্ত্রিসভার সোহরাওয়ার্দী ছিলেন বাণিজ্য ও শ্রম মন্ত্রী । এ সময় সরকার শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অনুমতি দেয় । এর ফলে শ্রমিকদের মদ্যে লীগের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায় । ১৯৩৮ সালে বঙ্গীয় আইনসভা মুসলমানদের জন্য চাকরিতে শতকরা ৬০ ভাগ সংরক্ষিত রাখার সুপারিশ করে । ১৯৩৮ সালে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগে আইন করা হয় যে , ন্যূনপক্ষে  শতকরা ৫০ জন মুসলমান নিয়োগ করা হবে । 

১৯৪০ সালে লাহোর অধিবেশনের বাংলাদেশ থেকে ফজলুল হকের নেতৃত্বে ৪০০ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন । এ অধিবেশনের ফজলুল হক প্রসিদ্ধ লাহোর প্রস্তাব বা পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন করেন । লাহোর প্রস্তাবে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোতে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবি করা হয় । ফজলুল হক কর্তিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন বাংলার মুসলিম লীগের প্রাণশক্তিকে বিপুল ভাবে উজ্জীবিত করে । কিন্তু শীঘ্রই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে ফজলুল হকের সম্পর্কের অবনতি ঘটে । জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদের সদস্য নিয়োগের বিষয় নিয়ে উভয়ের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় । ১৯৪০ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দেরকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদ নামে একটি পরিষদ গঠন করেন । এ পরিষদে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক , পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী সেকেন্দার হায়াত খান প্রমুখকে সদস্য করা হয় । কিন্তু এ পরিষদে লীগের শর্তসাপেক্ষে না হওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হন এবং তিনি ফজলুল হক ও প্রমুখকে প্রতিরক্ষা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করতে বলেন । একে ফজলুল হক অপমান বোধ করেন এবং যুগপৎ জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদ ও মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগ করেন । মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগের ফলে হক সাহেবের রাজনৈতিক শক্তি অনেকটা কমিয়ে যায়।  ১৯৪১ সালের ১৮ নভেম্বর তিনি ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর হিন্দু মহাসভা , ফরওয়ার্ড ব্লক, কৃষক প্রজা ও তফসিলী হিন্দু দলগুলোকে নিয়ে  ‘ প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টি গঠন করেন । ফজলুল হক এই দলের নেতা নির্বাচিত হন । ১৯১৪ সালের ১ ডিসেম্বর তিনি মুসলিম লীগ যুক্ত মন্ত্রিসভা ভেঙে দেন । 

দ্বিতীয় হক মন্ত্রিসভা ( ১৯৪১-৪৩): 

১৯৪১ সালের ১০ ডিসেম্বর বাংলার গভর্নর ফজলুল হককে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের আমন্ত্রণ জানান । ১১ ডিসেম্বর ভারতের রক্ষা আইনে কংগ্রেস নেতা শরৎ বসুকে গ্রেফতার করা হয় । সুতরাং শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাদ দিয়েই ১১ জনের পুর্ন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয় । দ্বিতীয় হক মন্ত্রিসভা ফজলুল হকসহ ৬ জন মুসলিম মন্ত্রী এবং ৫ জন হিন্দু মন্ত্রী ছিলেন।  হিন্দু মন্ত্রীদের মধ্যে হিন্দু মহাসভার ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের সন্তোস বসুর নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য । ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় । এজন্যই এই মন্ত্রিসভা ‘ শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা ‘  নামে পরিচিত । 

ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা মাত্র  ২ বছর ( ১৯৪১-৪৩) ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল । মুসলমানদের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা সত্ত্বেও এ মন্ত্রিসভার তেমন জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি । মুসলিম লীগ এ মন্ত্রিসভাকে সুনজরে দেখেন নি । কংগ্রেস হাই কমান্ডও এই মন্ত্রিসভার প্রতি তেমন উৎসাহ দেখায় নি । মুসলিম লীগ শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা গঠনের পর থেকেই এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলে । হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দ্বিতীয় হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে মুসলিম জনমত গঠন করার লক্ষ্যে সমগ্র বাংলাদেশ সফর করেন।  সোহরাওয়ার্দীর অসাধারণ প্রতিভা এবং মুসলিম লীগের ব্যাপক প্রচারের ফলে হক মন্ত্রিসভা মধ্যবিত্ত মুসলিম সম্প্রদায় এবং সমাজের আস্থা হারায় । এর ফলশ্রুতিতে নাটোর ও বালুরঘাটের উপনির্বাচনে হক সাহেবের প্রার্থীর লীগ প্রার্থীর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় । এ সময় হক মন্ত্রিসভা কতগুলো  রাজনৈতিক ভুল করে যার পরিমাণ মন্ত্রিসভা জন্য মারাত্মক হয়েছিল । সেগুলো নিম্নরূপ : – 

১) ১৮৪২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কলকাতায় আসলে তার উপর ১৪৪ ধারা নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় । এতে মুসলমানরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারকে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করতে হয় । 

২) ১৯৪২ সালের মে মাসে সরকার জরুরি কিছু বিধি জারি করেন। জরুরী  বিধির ১১ নং ধারা অনুসারে যে কোন ব্যক্তিকে আটক করার বিধান করা হয় । এর ফলে রাজনৈতিক মহলে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয় । 

৩) হিন্দুদের চাপে বঙ্গীয় আইনসভা বিবেচনাধীন মাধ্যমিক শিক্ষা বিলটি স্থগিত রাখা হয় । তৎকালে মাধ্যমিক শিক্ষা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল । প্রথম হক মন্ত্রিসভার প্রস্তাব ছিল মাধ্যমিক শিক্ষাকে আলাদা করে একটি বোর্ডের আওতায় নিয়ে আসা । উদ্দেশ্যটি ভালো ছিল । কিন্তু হিন্দুদের বিরোধিতার কারণে দ্বিতীয় হক মন্ত্রিসভায় বিলটি স্থগিত হয়ে যায় । লীগ নেতারা এ ঘটনাকে হক সাহেবের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন । 

৪) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন প্রতিষ্ঠাতা এ.আর.পি ( Air Raid Precaution ) কে সম্প্রসারণ করে সিভিল ডিফেন্স বিভাগ খোলা হয় । এই বিভাগে কলকাতার হিন্দুরা অধিকাংশ চাকরি পায় এবং মুসলমানরা বঞ্চিত হয় । মুসলিম লীগ নেতারা এবং তাদের মুখপাত্র ‘ আজাদ ‘ পত্রিকা িএ সুযোগ গ্রহণ করে তীব্র প্রতিবাদ জানায় । 

৫) ১৯৪২ সালের ২৪ অক্টোবর কিশোরগঞ্জে মসজিদের সামনে হিন্দুদের পূজা উৎসবের গান বাজনাকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে দাঙ্গা সংঘটিত হয় । ঐ দাঙ্গায় পুলিশের গুলিতে কয়েকজন মুসলমান নিহত হয় । মুসলমানরাই এই হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে । কিন্তু হক মন্ত্রিসভায় এ ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করলে মুসলমানদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয় । 

মুসলিম লীগের ব্যাপক বিরোধিতা সত্ত্বেও ফজলুল হক আইন সভায় তার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখতে সক্ষম হন । কিন্তু তাকে অন্য এক প্রতিপক্ষের সম্মুখীন হতে হয় । বাংলার গভর্নর স্যার জন হার্বার্ট হক সাহেবের মন্ত্রিসভায় সুভাষচন্দ্র বসু ফরওয়ার্ড ব্লকের সন্তোষ বসুর অন্তর্ভুক্তি মেনে নেননি । কারণ সুভাষ বসু ছিলেন ব্রিটিশদের পরম শত্রু । সুভাষ বসুর নেতৃত্বেই ‘ আজাদ হিন্দ ফৌজ ‘ গঠিত হয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম গড়ে ওঠে । ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে সুভাষ বসুর বড় ভাই  শরৎ বসুকে গ্রেফতার করা হয় । ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত ছাড়ো দাবি ও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন জোরদার হলে কঠোর নীতি গ্রহণ করেন এবং মন্ত্রিসভার মতামত অগ্রাহ্য করতে থাকেন । ফজলুল হক গভর্নরের এ অনিয়মতান্ত্রিক কার্যকলাপের তীব্র প্রতিবাদ করেন । এ সময় মেহেদী পুরে কংগ্রেস আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশী নির্যাতনের প্রতিবাদে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন । ফজলুল হকও স্যার জন হার্বাটকে এ বিষয়ে এক কড়া  চিঠি লেখেন । দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে । 

এসময় এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকায় ব্যাপক শস্যহানি, গবাদিপশুর প্রাণহানি এবং অসংখ্য ঘরবাড়ি ধ্বংস হয় । দেশে প্রচন্ড খাদ্য সংকট দেখা দেয় । এই খাদ্য সংকট মোকাবেলা করবার মতো জনসমর্থন হক মন্ত্রিসভার ছিল না । এমত অবস্থায় ১৯৪৩ সালের ২১ মার্চ দ্বিতীয় হক মন্ত্রিসভার পদত্যাগ করে। 

নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভা ও ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ: 

হক মন্ত্রিসভার পদত্যাগের পর ১৯৪৩ সালের ১৩ এপ্রিল খাজা নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা গঠন করে।  নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভা ৭ জন মুসলমান ও ৬ জন হিন্দু সদস্য ছিলেন । হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এ মন্ত্রিসভায় বেসামরিক সরবরাহ বিভাগের মন্ত্রী ছিলেন । দুর্ভাগ্যবশত খাজা নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভা গঠনের অল্পদিনের মধ্যে ১৯৪৩ সালে বাংলায় বয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় । এ দুর্ভিক্ষের জন্য বিশেষ কিছু কারণ ছিল । 

প্রথমত , এ সময় জার্মান কর্তিক ভারত আক্রমণের সম্ভাবনা ছিল । 

দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশ সরকার প্রচুর পরিমাণ খাদ্য শস্য গুদামজাত করে এবং সেনাবাহিনীর প্রয়োজনে বাইরে পাঠিয়ে দেয় । এর ফলে খাদ্য শস্যের অবাদ চলাচলে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয় । 

তৃতীয়ত, এসময় বিহার ও উড়িষ্যা সরকার তাদের উদ্বুদ্ধ খাদ্যশস্য বাংলাদেশের সরবরাহ করতে স্বীকার করে । 

চতুর্থত , জাপান ব্রহ্মদেশ দখল করলে সেখান থেকে চাল আমদানি বন্ধ হয়ে যায় । ব্রাহ্মদেশ থেকে বিতাড়িত হয় অনেক লোক বাংলাদেশ আশ্রয় নেয় । যাহোক , সর্বনাশা এই দুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করে । এই দুর্ভিক্ষের জন্য মুসলিম লীগ সরকার এককভাবে দায়ী ছিল না। ভারত সরকার ও হক মন্ত্রিসভা এই দুর্ভিক্ষের জন্য আংশিকভাবে দায়ী ছিল । যাহোক , দেশের এই ভয়াবহ দুর্যোগ মুহূর্তে খাদ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যশস্য সরবরাহ ও বিতরণ এর ব্যবস্থা করেন । এর ফলে লক্ষ লক্ষ অনাহার লোক মৃত্যুর পর থেকে রক্ষা পায় । 

খাজা নাজিমুদ্দিন বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন প্রায় দুই বছর । তার  সময়কালে বাংলার মুসলিম লীগের সংগঠন আরো শক্তিশালী হয় । অবশ্যই বাংলার মুসলিম লীগকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে  সোহরাওয়ার্দী ও প্রাদেশিক লীগ  সেক্রেটারি আবুল হাশেমের যথেষ্ট অবদান ছিল । তবে আইন সভায় নাজিমুদ্দিনের লীগ মন্ত্রিসভা খুবই দুর্বল ছিল । তাকে হিন্দু ও ইউরোপিয়ান সদস্যদের সমর্থনের ওপর অধিকাংশ নির্ভর করতে হতো । ১৯৪৫ সালের ২৮ মার্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিলের উপর ভোটগ্রহণ করা হলে নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভা পতন ঘটে । ফলে বাংলায় আবার ফজলুল হকের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠনের সম্ভাবনা দেখা দেয় । কিন্তু বাংলার গভর্নর আর.জি.কেসি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা এ কে ফজলুল হককে মন্ত্রিসভা গঠনের সুযোগ না দিয়ে প্রদেশে গভর্নরের শাসন জারি করেন । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

23 + = 29