গোল টেবিল বৈঠক

পটভূমি : 

১৯২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে মহাত্মা গান্ধীর সভাপতিত্বে কলকাতা যে অধিবেশন শুরু হয় সে অধিবেশনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ঘোষণা করে যে, ১১৯২৯ সালের ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে হয় সরকার নেহেরু রিপোর্ট পরিপূর্ণ রূপে গ্রহণ করবেন অথবা কংগ্রেস ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করবে।  অন্যদিকে , নেহেরু রিপোর্টের প্রতিবাদস্বরূপ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তার বিখ্যাত “ ১৪ দফা “ দাবি পেশ করলে ভারতীয় মুসলিম লীগ এর আলোকে ভারতীয় সংবিধান রচনার জন্য উৎসাহী হয়ে উঠে । ১৯৩০ সালে সাইমন কমিশন রিপোর্ট প্রকাশিত হলে তা ভারতের সব রাজনৈতিক দল কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয় । নেহেরু রিপোর্ট ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক গৃহীত না হওয়ার সমগ্র ভারতীয় আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয় । এরই পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকার ভারতের শাসনতান্ত্রিক সংকট নিরসনের উদ্দেশ্যে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ববিন্দুকে লন্ডনে এক গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রণ জানায় । 

প্রথম গোল টেবিল বৈঠক : 

১৯৩০ সালের ১২ নভেম্বর লন্ডনে প্রথম গোল টেবিল বৈঠক শুরু হয় । কংগ্রেসের অধিকাংশ নেতাই এসময় কারাগারে ছিলেন বিধায় ব্রিটিশ সরকার ভারতের বিভিন্ন দলের ও স্বার্থের প্রতিনিধিবৃন্দকে  এ বৈঠকে আমন্ত্রণ জানায় । ফলে প্রথম অধিবেশনে ভারত থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং দেশীয় রাজ্যের রাজন্যবর্গ যোগ দেন । বৈঠকে যোগদানকারী  ৮৯ জন প্রতিনিধির মধ্যে ১৬ জন ছিলেন ব্রিটিশ রাজনীতিক দলের প্রতিনিধি । প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্ড ব্রিটিশ প্রতিনিধিত্বের নেতৃত্ব দেন । এ অধিবেশনে ১৬ জন ছিলেন দেশীয় রাজ্য গুলোর প্রতিনিধি এবং ৫৭  জন ছিলেন ভারতীয় প্রতিনিধি । কংগ্রেস এ বৈঠকে যোগদান করেননি । ভারতীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যারা এই বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন তারা হলেন স্যার তেজবাহাদুর সাপ্রূ , মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ , শেরে বাংলা একে ফজলুল হক , ড. বি. আর . আম্বেদকার, চিন্তামণি প্রমুখ । রাজা পঞ্চম জর্জ এ বৈঠকের উদ্বোধন করেন এবং প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্ড এতে সভাপতিত্ব করেন । ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে ভারতের শাসনতান্ত্রিক সমস্যার সমাধান কল্পে কয়েকটি মৌলিক নীতির অবতারণা করেন যার উপর ভিত্তি করে আলোচনা শুরু হয় । 

১) ভারতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন ; 

২) প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচ সাপেক্ষে প্রদেশগুলোতে পূর্ণ দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠা ; 

৩) প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচ সাপেক্ষে কেন্দ্রে আংশিক দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠা । 

ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় পদ্ধতির সরকার গঠনের পক্ষে ভারতীয় এবং দেশীয় রাজ্যের সকল প্রতিনিধি সর্বসম্মত ঐক্যমতে উপনীত হয় । এ বৈঠকেই প্রথম দেশীয় রাজ্যের অধিপতিগন  ভারতীয় ফেডারেশনে যোগদান করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন । প্রদেশের স্বায়ত্তশাসন  প্রদানের ক্ষেত্রে ও প্রতিনিধিদের মধ্যে কোন বিরোধ ছিল না । কেন্দ্রে আংশিক দায়িত্বশীল সরকার প্রবর্তনের ধারণা ও বৈঠকে প্রতিনিধিবর্গ কর্তিক প্রশংসিত ও অভিনন্দিত হয় । 

কিন্তু সাম্প্রদায়িক প্রশ্নে বৈঠকে সদস্যদের মতবিরোধ দেখা দেয় । স্বাভাবিকভাবেই মুসলমান প্রতিনিধিগণ পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন । জিন্নাহ অত্যান্ত জোরালোভাবে তার ” ১৪ দফা সমর্থন করেন  । হরিজন শ্রেণীর মুখপাত্র  ড. আম্বেদকারও পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার পক্ষে মত প্রকাশ করেন । হিন্দু প্রতিনিধিবর্গ সংখ্যালঘু শ্রেণীর জন্য আসন সংরক্ষণের নিশ্চয়তা সাপেক্ষে যেীথ নির্বাচন ব্যবস্থার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন । এভাবে বৈঠকে উপস্থিত বিভিন্ন শ্রেণীর নেতৃবৃন্দ গুরুত্বপূর্ণ সাম্প্রদায়িক প্রশ্নে  একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় এবং এ সংক্রান্ত বিষয়ে নতুন কোন পন্থা উদ্ভাবন সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়।   

তবে, এ অধিবেশনে বিভিন্ন সমস্যা পরীক্ষা এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য কতগুলো সাব-কমিটি গঠন করা হয় । উল্লেখযোগ্য কমিটি ছিল , যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো সাব-কমিটি , সংখ্যালঘু সাব-কমিটি , প্রতিরক্ষার সাব-কমিটি , প্রদেশিক সংবিধান সাব-কমিটি , ভোটাধিকার সাব-কমিটি , চাকুরী সাব-কমিটির ইত্যাদি  । 

১৯৩১ সালের জানুয়ারি মাসে অনির্দিষ্ট কালের জন্য গোলটেবিল বৈঠক স্থগিত করা হয় । বৈঠকের সমাপনী ভাষণে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্ড ভারতের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সমস্যার সমাধানে বৈঠকে যোগদান কারী প্রতিনিধিবর্গ যেসব মৌলিক বিষয়ে একমত পোষণ করেন তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য করেন এবং আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে , কংগ্রেস আগামী গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করে ভারতের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র প্রণয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে । 

দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক : 

১৯৩১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক আহবান করা হয় । ১৯৩১ সালের ৫ মার্চ গান্ধী -আরউইন চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে মহাত্মা গান্ধী আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয় । ব্রিটিশ সরকার ও কংগ্রেস দলীয় রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেন । পাঁচ ওয়াক্ত পড়ি না এই চুক্তির বলে গান্ধী কংগ্রেসর  একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে গোলটেবিল বৈঠকের দ্বিতীয় অধিবেশনে যোগদান করেন । প্রথম অধিবেশনে যোগদানকারী অধিকাংশ সদস্য এ সম্মেলনে যোগ দেন । 

ইতিমধ্যে ১৯৩০ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে । লেবার পার্টির স্থলে বৃটেনের জাতীয় সরকার গঠিত হয় । তবে ম্যাকডোনাল্ডই বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী থাকেন । ভারত সচিব পদে মিঃ ওয়েজগুডের স্থলে আসেন গোঁড়া রক্ষণশীল মনোভাবসম্পন্ন স্যার স্যামুয়েল হোয়ের । 

 অত্যান্ত প্রতিকূল পরিবেশে সম্মেলনের অধিবেশন শুরু হয় । এ অধিবেশনের দুটি সাব-কমিটি যথা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো কমিটি ও সংখ্যালঘু কমিটি গঠিত হয় । এই দুই কমিটি প্রথম অধিবেশনে গঠিত অনুরূপ কমিটিগুলোর রিপোর্টসমূহ পুনঃপরীক্ষা ও আরোও  বিশদভাবে বর্ণনা করে।  গান্ধী প্রথম গোলটেবিল বৈঠকে গৃহীত কতিপয় সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেন । কেন্দ্রে দ্বৈত শাসন কিংবা অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা কোনোটিতেই তিনি রাজি ছিলেন না । তিনি কেন্দ্র ও প্রদেশে একই দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানায় । 

 এ সম্মেলনে ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হন । গান্ধীজীর সাম্প্রদায়িক সমস্যা নিরসনের জোর প্রচেষ্টা চালান।  কিন্তু সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিরা নিজের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে এত সজাগ ছিলেন যে , একত্রে কোন আপোষরফা সম্ভব হয়ে উঠেনি । ফলে সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্ডের উপর অর্পিত হয় । এভাবে যে উদ্দেশ্যে সম্মেলন আহ্বান করা হয়েছিল তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় ।  ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর গোলটেবিল বৈঠকের দ্বিতীয় অধিবেশনের সমাপ্তি ঘটে । 

সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ : 

পূর্বে আলোচিত হয়েছে যে , ভারতের সাম্প্রদায়িক সমস্যা নিরসনে প্রথম ও দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়।  দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকের উদ্বোধনী ভাষণে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্ড  সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে সাম্প্রদায়িক সমস্যা নিরসনে ভারতীয়রা মতৈক্যে উপনীত হতে ব্যর্থ হলে ব্রিটিশ সরকার নিজস্ব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে বাধ্য হবে । গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ভারতীয় প্রতিনিধিবৃন্দ সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নের সর্বসম্মত কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পারায় ১৯৩২ সালের ১৬ আগস্ট রামসে ম্যাকডোনাল্ড রোয়েদাদ ঘোষনা করেন । ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্ডের উক্ত ঘোষণা “ সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ “ বা সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা ( Communal Award ) নামে পরিচিত । 

সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের মূল শর্ত সমূহ : 

১) এ রোয়েদাদ শুধুমাত্র প্রদেশিক আইন পরিষদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল । কেন্দ্রীয় আইন সভায় আসন এর ব্যাপারে  রোয়েদাদে কিছুই বলা হয়নি । 

২) বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশের মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্তেও আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা  হয় । 

৩) যেসব প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘিষ্ঠ সেখানে মুসলমানদের ক্ষেত্রে “ গুরুদায়িত্ব “ অর্থাৎ সংখ্যার তুলনায় বেশি আসন দানের নীতি মেনে নেওয়া হয় । অনুরূপভাবে পাঞ্জাবে শিখদের , হিন্দু ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ হিন্দুদের এবং বাংলায় ইউরোপীয়দের সেখানকার আইন পরিষদ গুলোতে সংখ্যার তুলনায় বেশি আসন দান করা হয় । 

৪) উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ছাড়া বাকি সব প্রদেশগুলোর আইন সভায় মহিলাদের জন্য  ৩%  আসন সংরক্ষণ করা হয়।  

৫) হরিজনদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় । তাদের জন্য পৃথক আসন বরাদ্দ করা হয় । রোয়েদাদে বলা হয় , সাধারণ নির্বাচনে তারা অন্যান্য ভোটারদের মতোই ভোট দিতে পারবে । হরিজনদের জন্য কিছু সংরক্ষিত আসনও থাকবে । এই সংরক্ষিত আসনের শুধুমাত্র অনুন্নত শ্রেণীর নির্বাচকরাই  ভোট দিতে পারবে। অর্থাৎ অনুন্নত শ্রেণীর ভোটাররা দুবার ভোটদানের অধিকার হয়। যেসব অঞ্চলে অনুন্নত শ্রেণীর সংখ্যায় বেশি সেখানেই সংরক্ষিত আসন দেওয়া হয়। 

৬) এ রোয়েদাদে ভারতীয় খ্রিস্টান এবং এ্যাংলো – ইন্ডিয়ানদের পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী লাভের অধিকার দেওয়া হয়। 

৭) শ্রমিক, শিল্পপতি , জমিদার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দিষ্ট আসন পৃথক নির্বাচনী এলাকা প্রদান করা হয় । 

এখানে উল্লেখ্য যে , সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ ছিল এক অস্থায়ী বন্দোবস্ত । সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়গুলোকে নিজেদের মধ্যে চুক্তি ও মতৈক্যের মাধ্যমে রোয়েদাদের বিধানসমূহ সংশোধন করার অধিকার দেওয়া হয়।  

প্রতিক্রিয়া : 

সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ ঘোষিত হলে কংগ্রেস থেকে এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয় । গান্ধীজী উপলব্ধি করেন যে , সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা চালু হলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐক্য ভেঙ্গে পড়বে এবং রাজনৈতিক দিক হতে তাদের সর্বনাশ হবে । তিনি ১৯৩২ সালের ২৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্ডের কাছে এক পত্রের মাধ্যমে জানান যে তিনি জীবন দিয়ে হলেও হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐক্য রক্ষা করবেন । এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রোয়েদাদ এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেন । তিনি কংগ্রেসর  জাতীয় সম্মেলনের সভাপতি পন্ডিত মদনমোহন মালব্যকে টেলিগ্রাম ও পত্রের মাধ্যমে রোয়েদাদ রহিত করার জন্য অনুপ্রাণিত করেন । তিনি উল্লেখ করেন , এটি জাতির রাজনৈতিক সংহতি বিনাশের সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের এক পরিকল্পিত চক্রান্ত । ১৯৩২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর মহাত্মা গান্ধী রোয়েদাদ রহিত করার জন্য আমরণ অনশন করেন।  

পুনা চুক্তি : 

গান্ধীজীর অনশনে ব্রিটিশ সরকার কোন গুরুত্বই দেয়নি । গান্ধীজীর অমূল্য জীবন রক্ষায় এ সময় হিন্দু ও অনুন্নত শ্রেণীর নেতৃবৃন্দ জোর তাগিদ অনুভব করেন । কংগ্রেস ও অনুন্নত শ্রেণীর নেতারা , বোম্বাই ও পুনা  শহরে আলোচনায় মিলিত হয় । শেষ পর্যন্ত গান্ধীজি ও অনুন্নত শ্রেণীর নেতা ড.আম্বেদকারের মধ্যে এক আপোষরফা হয় । এ আপোষরফায় “ পুনা চুক্তি “ নামে খ্যাত । 

চুক্তির শর্তসমূহ : 

১) হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন স্বতন্ত্র নির্বাচন চালু করা হবে না । সকল হিন্দু সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেবে।  

২) এ চুক্তিতে হরিজন’ বা অনুন্নত হিন্দু শ্রেণীকে সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ যে  আসন দেওয়া হয় তা থেকে বেশি আসন বরাদ্দ করা হয় । ভারতের সকল প্রদেশের আইনসভায় তাদের জন্য মোট ১৪৮ টি আসন সংরক্ষণ করা হয় । কিন্তু সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদে তাদের জন্য  ৭১ টি আসন দেওয়া হয়েছিল । 

৩) এসব আসনের দুটি পর্যায়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে । প্রথম পর্যায়ে প্রতি সংরক্ষিত আসনের প্রার্থী মনোনয়নের জন্য প্রথমে শুধু অনুন্নত শ্রেণীর নির্বাচনের ভোটে ৫ জন প্রার্থী নির্বাচিত হবেন । দ্বিতীয় পর্যায়ের সকল শ্রেণীর হিন্দু ভোটে  এই ৫ জনের মধ্যে একজন নির্বাচিত হবেন । 

৪) কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে ১৭% আসন অনুন্নত শ্রেণীর জন্য সংরক্ষিত থাকবে । 

৫) স্থানীয় সংস্থায় এবং সরকারি চাকরিতে যোগ্যতা সাপেক্ষে হরিজন’ বা অনুন্নত শ্রেণীর হিন্দুদের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হবে । 

৬) প্রাদেশিক বাজেটের প্রতি শিক্ষা মঞ্জুরিতে হরিজনদের জন্য শিক্ষার পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা হবে । 

পুনা চুক্তি ১৯৩২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক স্বীকৃতি হয়। 

তৃতীয় গোলটেবিল বৈঠক : 

১৯৩২ সালের ১৭ নভেম্বর ভারত সচিব স্যার স্যামুয়েল হোর একান্ত অনিহার  মধ্যে তৃতীয় গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করেন । বারত হতে কিছু কিছু রাজ্য অনুগত  , সাম্প্রদায়িক ও উদারপন্থী এবং ইংল্যান্ড হতে প্রতিক্রিয়াশীল কিছু ব্যক্তি এ অধিবেশনে যোগদান করেন । ইংল্যান্ডের শ্রমিকদল এ অধিবেশনে যোগদান থেকে বিরত থাকে । ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস  এ অধিবেশনে যোগ দেয়নি । এ অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ তেমন কিছুই অর্জিত হয়নি । বৈঠকে শুধুমাত্র দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকের বিভিন্ন সাব-কমিটির রিপোর্টসমূহ আলোচিত হয় । ভারতের নতুন সংবিধান এর রুপ রেখা সম্পর্কে এ বৈঠকে আলোচিত হয়।  ভারতীয় প্রতিনিধিবর্গ এ বৈঠকে কিছু প্রগতিশীল ও গঠনমূলক প্রস্তাব দেন।  কিন্তু ব্রিটিশ সরকার সেসব প্রস্তাবের কোন গুরুত্ব দেয়নি । আসলে ইংল্যান্ডের ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল সরকারের ভারতীয়দের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি কোন শ্রদ্ধা বোধ ছিল না । ১৯৩২ সালের ২৪ নভেম্বর তৃতীয় গোলটেবিল বৈঠকের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয় । 

শ্বেতপত্র : 

গোলটেবিল বৈঠক শেষ হওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার ভারতের সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে ১৯৩৩ সালের মার্চ মাসে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেন । এই শ্বেতপত্রে কেন্দ্রে দ্বৈত শাসন এবং প্রদেশসমূহে দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয় । শ্বেতপত্রে উদযাপিত প্রস্তাব ও পরিকল্পনা ভারতীয়দের কাছে গ্রহন যোগ্য ছিল না । ভারতের সকল রাজনৈতিক দল এই শ্বেতপত্রের নিন্দা করে। যাহোক , ভারতীয়দের বিরোধিতা ও সমালোচনা সত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকার ভারতের সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয় । 

যেীথ পার্লামেন্টারি কমিটি : 

সেতো পত্রে উল্লেখিত সরকারি প্রস্তাবসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সে সম্পর্কে রিপোর্ট পেশ করার জন্য ১৯৩৩ সারের ১১ এপ্রিল একটি যৌথ সিলেক্ট কমিটি গঠন করা হয় ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের ১৬ জন সদস্য নিয়ে কমিটি গঠিত হয়।  এই কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন লর্ড লিনলিথগো । এ কমিটি ব্রিটিশ ভারত ও দেশীয় রাজ্যের কয়েকজন প্রতিনিধিকে ইংল্যান্ডে আমন্ত্রণ জানায় এবং তাদের সাহায্য গ্রহণ করেন । কমিটি  ১৯৩৪ সালের ২২ নভেম্বর রিপোর্ট পেশ করে । যদিও যৌথ পার্লামেন্টারি কমিটির শ্বেতপত্রে উল্লেখিত কোন প্রস্তাবলির পরিবর্তন সাধন করেন নি , তথাপি কমিটি প্রাদেশিক এবং ফেডারেল আইন পরিষদের গঠন প্রণালী ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব পরিবর্তনের সুপারিশ করেছিলেন । যৌথ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ভারত শাসন আইন প্রণীত হয় এবং তা  ১৯৩৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কমন্সসভায় উপস্থাপন করা হয় । বৃটেনের শ্রমিকদল এ বিলে অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে কড়া সমালোচনা করে । শ্রমিক দলের সদস্যবিন্দু ভারতকে ডোমিনিয়নের মর্যাদা প্রদানের লক্ষ্যে এ বিলের সংশোধনের চেষ্টা করেন । অপরপক্ষে , উইন্সটন চার্চিলের নেতৃত্বে গোড়াপন্থীরা এ বিলকে শুধু সমর্থন করেননি , এ বিলে কিছু প্রতিক্রিয়াশীল উপাদান ও সংযুক্ত করার চেষ্টা করেন । যাহোক , এ বিল ১৯৩৫ সালের ৪ জুন কমন্সসভা কর্তৃক এবং জুলাই মাসে লর্ডসভা কর্তৃক পাস হয় । উভয় কক্ষের এ  বিল পাস হওয়ার পর ১৯৩৫ সালের ২ আগস্ট এ বিল ব্রিটিশ রাজের অনুমতি লাভ করে। এভাবে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন বিধিবদ্ধ হয় । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 + 2 =