আগস্ট প্রস্তাব

১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড লিগালিথগো ভারতীয় নেতাদের সাথে কোনো পরামর্শ ছাড়াই ভারত বৃটেনের পক্ষে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে বলে ঘোষণা করেন । লিনলিথগোর এই স্বৈরাচারী আচরণের কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হন । গভর্নর জেনারেলের নীতির প্রতিবাদে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির নির্দেশে প্রদেশ থেকে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে । মুসলিম লীগ প্রদেশ থেকে কংগ্রেস মন্ত্রিসভার পদত্যাগের দিনটিকে ‘ মুক্তি দিবস ‘ হিসেবে পালন করে । 

এদিকে ১৯৩৯ সালের ১৪ সেপটেম্বর কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে নাৎসীবাদ ও ফ্যাসিবাদের তীব্র নিন্দা করে সর্বসম্মতক্রমে এক প্রস্তাব গৃহীত হয় । প্রস্তাবে বলা হয় যে, ব্রিটিশ সরকার অবিলম্বে কেন্দ্রে জাতীয় সরকার গঠন করতে সম্মত হলে এবং যুদ্ধের পর ভারতকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলে কংগ্রেস সরকারের সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছে । কংগ্রেস দলের প্রস্তাব প্রকাশিত হওয়ার চারদিন পর মুসলিম লীগের কার্যনির্বাহী কমিটি দাবী করে যে , মুসলিম লীগ এই ভারতীয় মুসলমানদের একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং মুসলিম লীগের সম্মতি ও অনুমোদন ব্যতীত কোন শাসনতান্ত্রিক  পরিকল্পনায় মুসলমানদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না । কংগ্রেস মুসলিম লীগের প্রস্তাব ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বড়লাট লিনলিথগো ১৮ অক্টোবর ঘোষণা করেন যে , যুদ্ধ শেষ হলে ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায় , রাজনৈতিক দল এবং দেশীয় রাজন্যবর্গের প্রতিনিধিদের সাথে পরামর্শক্রমে এবং তাদের সহযোগিতা নতুন শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা হবে । তাচারা , যুদ্ধ পরিচালনার জন্য ভারতে একটি যুদ্ধ উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হবে । এ বিষয়ে বড়লাট লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং কংগ্রেস সভাপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের সাথে আলোচনা করেন এবং কেন্দ্রীয় শাসন হিন্দু-মুসলিম সহযোগিতার ওপর বিশেষ জোর দেন । জিন্নাহ এবং রাজেন্দ্র প্রসাদ হিন্দু-মুসলমান সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন । কিন্তু কোনরূপ মীমাংসায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।  এ আলোচনা কংগ্রেস দাবি করে যে , স্বাধীন ভারতের সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব গণপরিষদের হাতে অর্পণ করতে হবে এবং নির্বাচিত গণপরিষদে ভারতের সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম । কংগ্রেসের এ দাবি মুসলিম লীগ প্রত্যাখান করে ।  

১৯৪০ সালের ২৭ জুন জিন্নাহ বড়লাটের সাথে দেখা করে কয়েকটি শর্ত উপস্থাপন করে এবং বলেন যে , শর্তগুলি গ্রহণ করা হলে মুসলিম লীগ সরকারের যুদ্ধ প্রচেষ্টা সহযোগিতা করবে । 

প্রথমত , সরকার লাহোর প্রস্তাবের পরিপন্থী কোনো ঘোষণা করবে না । 

দ্বিতীয়ত, লীগের সম্মতি ছাড়া কোন স্থায়ী বা অস্থায়ী শাসনতন্ত্রের পরিকল্পনা গ্রহণ করবে না । 

তৃতীয়ত, বড়লাটের শাসন পরিষদে , যুদ্ধ পরিষদে গভর্নরের উপদেষ্টা কমিটি মুসলিম সদস্যগণ মুসলিম লীগ কর্তৃক মনোনীত হবেন । 

ভারতের রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের লক্ষ্যে এবং যুদ্ধ পরিচালনা ভারতীয় জনগণকে জড়িত করার উদ্দেশ্যে অতঃপর ব্রিটিশ সরকার ১৯৪০ সালের ৮ আগস্ট একটি প্রস্তাব পেশ করে।  এটিই “ আগস্ট প্রস্তাব “ নামে পরিচিত । এ প্রস্তাবে নিম্নলিখিত ঘোষণা করা হয় যে : – 

১) ভারতকে ডোমিনিয়নের মর্যাদা দানই সরকারের লক্ষ্য । 

২) সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব ভারতীয়দের হাতে ন্যস্ত করা হবে । 

৩) সংবিধান প্রণয়নের সময় সংখ্যালঘুদের মতামতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হবে । 

৪) সকল রাজনৈতিক দলের কিছু সংখ্যক প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করে বড়লাটের শাসন পরিষদের সম্প্রসারণ করা হবে।  

৫) সকল রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে বড়লাট একটি যুদ্ধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করবেন । 

কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া : 

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস আগস্ট প্রস্তাবকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন । কংগ্রেস প্রতিরক্ষার উপর নিয়ন্ত্রণ রেখে একটি জাতীয় সরকার’ গঠনের দাবি জানিয়েছিল।  কিন্তু আগস্ট প্রস্তাবে শুধুমাত্র শাসন পরিষদের সম্প্রসারণ এর কথা বলা হয়।  তাছাড়া , এ প্রস্তাবে সাম্প্রদায়িক প্রশ্নের যে নীতি ব্যক্ত করা হয় তাকে কংগ্রেস ভারতের প্রগতির পথে বিরাট বাধা হিসেবে গণ্য করে । বড়লাট অগাস্ট প্রস্তাব নিয়ে কংগ্রেস সভাপতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সাথে আলোচনার প্রস্তাব নিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন । গান্ধীজী আগস্ট প্রস্তাব সম্পর্কে তার অভিমত ব্যক্ত করে বড়লাট কে লেখেন “ I have very carefully read your pronouncement and slept over it . It has made me sad. Its implications frighten me” 

লীগের প্রতিক্রিয়া : 

আগস্ট প্রস্তাব সম্পর্কে লীগের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন প্রকৃতির । মুসলিম লীগের ওয়াকিং কমিটি ঐ প্রস্তাকে  স্বাগতম জানাই যে অংশটি কংগ্রেস কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়।  মুসলিম লীগের মতে, আগস্ট প্রস্তাব এর ব্যাখ্যায় দেয় যে, মুসলিম লীগের সম্মতি ও অনুমোদন ছাড়া ভবিষ্যতে কোনো সাংবিধানিক কার্যক্রম গৃহীত হবে না । মুসলিম লীগ এ অভিমত ব্যক্ত করেছে , ভারতের বর্তমান সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো ভারত বিভক্তি । কিন্তু এ সত্ত্বেও মুসলিম লীগ আগস্ট প্রস্তাব গ্রহণও করেননি , আবার প্রত্যাখ্যান করেনি । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

45 ÷ 9 =