দেনাপাওনা

            রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

পাঁচ ছেলের পর যখন এক কন্যা জম্মিল তখন বাপ-মায়ে অনেক আদর করিয়া তাহার নাম রাখিলেন নিরুপমা । এ গোষ্ঠীতে এমন শেীখিন নাম ইতিপূর্বে কখনও শোনা যায় নাই । প্রায় ঠাকুর-দেবতার নামই প্রচলিত ছিল- গনেশ কার্তিক পার্বতী তাহার উদাহরণ । 

এথন নিরূপমার বিবাহের প্রস্তাব চলিতেছে । তাহার পিতা রামসুন্দর মিত্র অনেক খোঁজ করেন কিন্তু পাত্র কিছুতেই মনের মতন হয় না । অবশেষে মস্ত এক রায়বাহাদুরের য়রের একমাত্র ছেলেকে সন্ধান করিয়া বাহির করিয়াছেন । উক্ত রায়বাহাদুরের পৈতৃক বিষয়-আশয় যদিও অনেক হ্রাস হইয়া আসিয়াছে কিন্তু বনেদী ঘর বটে । 

বরপক্ষ হইতে দশ হাজার টাকা পণ এবং বহুল দানসামগ্রী চাহিয়া বসিল । রামসুন্দর কিছুমাত্র বিবেচনা না করিয়া তাহাতেই সম্মত হইলেন : এমন পাত্র কোনোমতে হাতছাড়া করা যায় না । 

কিছুতেই টাকার জোগাড় আর হয় না । বাঁধা দিয়া, বিক্রয় করিয়া, অনেক চেষ্টাতেও হাজার ছয়-সাত বাকি রহিল । এ দিকে বিবাহের দিন নিকট হইয়া আসিয়াছে । 

অবশেষে বিবাহের দিন উপস্থিত হইল । নিতান্ত অতিরিক্ত সুদে একজন বাকি টাকাটা ধার দিতে স্বীকার করিয়াছিল, কিন্তু সময়কালে সে উপস্থিত হইল না । বিবাহসভায় একটা তুমুল গোলযোগ বাধিয়া গেল । বামসুন্দর আমাদের রায়বাহাদুরের হাতে-পায়ে ধরিয়া বলিলেন, “ শুভকার্য “ সম্পন্ন হইয়া যাক, আমি নিশ্চয় টাকাটা শোধ করিয়া দিব ।’ রায়বাহাদুর বলিলেন, “ টাকা হাতে না পাইলে বর সভাস্থ করা যাইবে না।’ 

এই দুর্ঘটনায় অন্তঃপুরে একটা কান্না পড়িয়া গেল । এই গুরুতর বিপদের যে মূল কারণ সে চেলি পরিয়া, গহনা পরিয়া, কপালে চন্দন লেপিয়া চুপ করিয়া বসিয়া আচে । ভাবী শ্বশুরকুলের প্রতি যে তাহার খুব-একটা ভক্তি কিংবা অনুরাগ জম্মিতেছে, তাহা বলা যায় না । 

ইতিমধ্যে একটা সুবিধা হইল । বর সহসা তাহার পিতৃদেবের অবাধ্য হইয়া উঠিল । সে বাপকে বলিয়া বসিল, “ কেনাবেচা -দরদামের কথা আমি বুঝি না; বিবাহ করিতে আসিয়াছি , বিবাহ করিয়া যাইব ।’ 

বাপ যাহাকে দেখিল তাহাকেই বলিল,” দেখেছেন মহাশয়, আজকালকার ছেলেদের ব্যবহার?’ দুই-একজন প্রবীণ লোক ছিল , তাহারা বলিল, “ শাস্ত্রশিক্ষা নীতিশিক্ষা একেবারে নাই, কাজেই” । 

বর্তমান শিক্ষার বিষময় ফল নিজের সন্তানের মধ্যে প্রত্যক্ষ করিয়া রায়বাহাদুর হতোদ্যম হইয়া বসিয়া রহিলেন । বিবাহ একপ্রকার বিষন্ন নিরানন্দভাবে সম্পন্ন হইয়া গেল । 

শ্বশুরবাড়ি যাইবার সময নিরুপমাকে বুকে টানিয়া লইয়া বাপ আর চোখের জল রাখিতে পারিলেন না । নিরূ জিগ্রাসা করিল,” তারা কি আর আমাকে আসতে দেবে না, বাব?’ বামসুন্দর বলিলেন, ‘ কেন আসতে দেবে না মা । আমি তোমাকে নিয়ে আসব ।’ 

রামসুন্দর প্রায়ই মেয়েকে দিখিতে যান কিন্তু বেহােইবাড়িতে তাঁর কোনো প্রতিপত্তি ছিল না । চাকরগুলো পর্যন্ত তাঁহাকে নিচু নজরে দেখে । অন্তঃপুরের বাহিরে একটা স্বতন্ত্র ঘরে পাঁচ মিনিটের জন্য কোনোদিন বা মেয়েকে দেখিনে পান, কোনো দিন-বা দেখিতে পান না । 

কুটম্বগৃহে এমন করিয়া আর অপমান তো সহ্য হয় না । রায়সুন্দর স্থির করিলেন, যেমন করিয়া হউক টাকাটা শোধ করিয়া দিতে হইবে । 

কিন্তু যে ঋনভার কাঁধে চাপিয়াছে তাহারই ভার সামলানো দুঃসাধ্য । খরচপত্রের অত্যন্ত টানাটানি পড়িয়াছে এবং পাওনাদারদের দৃষ্টিপথ এড়াইবার জন্য সর্বদাই নানারূপ হঅন কেীশল অবলম্বন করিতে হইতেছে । 

এদিকে শ্বশুরবাড়ি উঠিতে বসিতে মেয়েকে খোঁটা লাগাইতেছে । পিতৃগৃহের নিন্দা শুনিয়া ঘরে দ্বার দিয়া অশ্রুবিসর্জন তাহার নিত্যাক্রিয়ার মধ্যে দাঁড়াইয়াছে । 

বিশেষত শাশুড়ির আক্রোশ আর কিছুতেই মেটে না । যদি কেহ বলে, ‘ আহা কী শ্রী ।বউয়ের মুখখানি দেখিলে চোখ জুড়াইয়া যায় । ‘ শাশুড়ি ঝংকার দিয়া উঠিয়া বলে, ‘ শ্রী তো ভারি । যেমন ঘরের মেয়ে তেমনি শ্রী । 

এমনকি , বউয়ের খাওয়াপরারও যত্ন হয় না । যদি কোনো দয়াপরতন্ত্র প্রতিবেশিনী কোনো ত্রুটি উল্লেখ কনে , শাশুড়ি বলে, ‘ ওই ঢের হয়েছে ।’ অর্থাৎ বাপ ‍যদি পুরা দাম দিত তো মেয়ে পুরা যত্ন পাইত । সকলেই এমন ভাব দেখায় যেন বধূর এখানে কোনো অধিকার নাই, ফাঁকি দিয়াপ্রবেশ করিয়াছে ।

বোধ হয়, কন্যার এই-সকল অনাদর এবং অপমানের কথা বাপের কানে গিয়া থাকিবে । তাই রামসুন্দর অবশেষে বসতবাড়ে বিক্রয়ের চেষ্টা করিতে লাগিলেন । 

কিন্তু ছেলেদের যে গৃহহীন করিতে বসিয়াছেন সে কথা তাহাদের নিকট হইতে গোপনে রাখিলেন স্থির করিয়াছিলেন, বাড়ি বিক্রয় করিয়া সেই বাড়ি ভাড়া লইয়অ বাস করিবেন; এমন কেীশলে চলিবেন যে, মৃত্যুর পূর্বে এ কথা ছেলেরা জানিতে পারিবে না । 

কিন্তু ছেলেরা জানিতে পারিল। সকলে আসিয়া কাঁদিয়া পড়িল । বিশেষত বড়ো তিনটি ছেলে বিবাহিত এবং তাহাদের কাহারো – বা সন্তান আছে । তাদের আপত্তি অত্যন্ত গুরুতর হইয়া দাঁড়াইল, বাড়ি বিক্রয় স্থগিত হইল । 

তখন রামসুন্দর নানা স্থান হইতে বিস্তর সুদে অল্প অল্প করিয়া টাকা দ্বার করিতে লাগিলেন । এমন হইল যে, সংসারের খরচ আর চলে না । 

নিরু বাপের মুখ দেখিয়া সব বুঝিতে পারিল । বৃদ্ধের পক্ব কেশে, শুষ্ক মুখে এবং সদাসসংকুচিত ভাবে দৈন্য এবং দুশ্চিন্তা প্রকাশ হইয়া পড়িল । মেয়ের কাছে যখন বাপ অপরাধী তখন সে অপরাধের অনুতাপ কি আর গোপন রাখা যায় । রামসুন্দর যখন বেহাইবাড়ির অনুমতিক্রমে ক্ষণকালের জন্য কন্যার সাক্ষাৎলাভ করিতেন তখন বাপের বুক যে কেমন করিয়া ফাটে তাহা তাঁহার হাসি দেখিলেই টের পাওয়া যাইত । 

সেই ব্যথিত পিতৃহৃদয়কে সান্ত্বনা দিবার উদ্দেশ্যে দিনকতক বাপের বাড়ি যােইবার জন্য নিরু নিতান্ত অধীর হইয়া উঠিয়াছে । বাপের স্ম্লন মুখ দিখিয়া সে আর দূরে থাকিতে পারে না । একদিন রামসুন্দরকে কহিল, ‘ বাবা , আমাকে একবার বাড়ি লইয়া যাও । রামসুন্দর বলিলেন, ‘ আচ্ছা ।’ 

কিন্তু তাঁহার কোনো জোর নাই- নিজের কন্যার উপরে পিতার যে স্বাভাবিক অধিকার আছে তাহা যেন পণের টাকার পরিবর্তে বন্ধক রাখিতে হইয়াছে । এমনকি, কন্যার দর্শন সেও অতি সসংকোচে ভিক্ষা চাহিতে হয় এবং সময়বিশেষে নিরাশ হইলে দ্বিতীয় কথাটি কহিবার মুখ থাকে না । 

কিন্তু মেয়ে আপনি বাড়ি আসিতে চাহিলে বাপ তাহাকে না আনিয়া কেমন করিয়া থাকে , তাই, বেহাইয়ের নিকট সে সম্বন্ধে দরখাস্ত পেশ করিবার পূর্বে রামসুন্দর কত হীনতা, কত অপমান, কত ক্ষতি স্বীকার করিয়া যে তিনটি হাজার টাকা সংগ্রহ করিয়াছিলেন , সে ইতিহাস গোপন থাকাই ভালো । 

নোট-কখানি রুমালে জড়াইয়া চাদরে বাঁধিয়া রামসুন্দর বেহাইয়ের নিকট গিয়া বসিলেন । প্রথমে হাস্যমুখে পাড়ার খবর পাড়িলেন । হরেকৃষ্ণের বাড়িতে একটা মস্ত চুরি হইয়া গিয়াছে , তাহার অদ্যোপান্ত বিবরণ বলিলেন ; নবীনমাধব ও রাধামাধব দুই ভাইয়ের তুলনা করিয়া বিদ্যাবুদ্ধি ও স্বভাব সম্বন্ধে রাধামাধবের সুখ্যাতি এবং নবীনমাধবের নিন্দা করিলেন ; শহরে একটা নতুন ব্যামো আসিয়াছে , ‘হাঁ হাঁ , বেহাই, সেই টাকাটা বাকি আছে বটে । রোজই মনে করি , যাচ্ছি অমনি হাতে করে কিছু নিয়ে যাই, কিন্তু সময়কালে মনে থাকে না । আর ভাই, বুড়ো হয়ে পড়েছি ।’ এমনই এক দীর্ঘ ভূমিকা কোরিয়া  পঞ্চরের তিনখানি অস্তির মতো সেই তিনখানি নোট যেন অতি সহজে অতি অবহেলে বাহির করিলেন । সবেমাত্র তিন হাজার  টাকার নোট দেখিয়া রায়বাহাদুর অট্টহাস্য করিয়া উঠিলেন । 

বলিলেন ,’ থাক, বেহাই, ওতে আমার কাজ নেই । একটা প্রচলিত বাংলা প্রবাদের উল্লেখ করিয়া বলিলেন , সামান্য কারণে হাতে দুর্গন্ধ করিতে তিনি চায় না । 

এই ঘটনার পরে মেয়েকে বাড়ি আনিবার প্রস্তাব কাহাও মুখে আসে না- কেবল রামসুন্দর ভাবিলেন , সে-সকল কুটুম্বিতার সংকোচ আমাকে আর শোভা পায় না ।’ মর্মাহতভাবে অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া অবশেষে মৃদুস্বরে কথাটা পাড়িলেন । রায়বাহাদুর কোন কারণ মাত্র উল্লেখ না করিয়া বলিলেন, ‘ সে এখন হচ্ছে না ।’ এই বলিয়া কর্মোপলক্ষে স্থানান্তরে চলিয়া গেলেন । 

রামসুন্দর মেয়ের কাছে মুখ না দেখাইয়া কম্পিত হাতে কয়েকখানি নোট চাদরের প্রান্তে বাঁধিয়া বাড়ি ফিরিয়া গেলেন । মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলেন, যতদিন না সমস্ত টাকা শোধ করিয়া দিয়া অসংকোচে কন্যার উপরে দাবি করিতে পারিবেন ততদিন আর বেহাইবাড়িতে যাইবেন না । 

বহুদিন গেল।  নিরুপমা লোকের উপর লোক পাঠায় কিন্তু বাপের দেখা পায় না অবশেষে অভিমান করিয়া লোক পাঠানো বন্ধ করিল তখন রামসুন্দরের মনে বড় আঘাত লাগিল , কিন্তু তবু গেলেন না । 

আশ্বিন মাস আসিল । রামসুন্দর বলিলেন , ‘ এবার পূজার সময় মাকে ঘরে আনিবই , নহিলে আমি – ’ খুব একটা শক্ত রকম শপথ করিলেন । 

পঞ্চমী কি ষষ্ঠীর দিনে আবার চাদরের প্রান্তে গুটিকতক নোট বাদিয়া রামসুন্দর যাত্রার উদ্যোগ করিলেন । পাঁচ বছরের এক নাতি আসিয়া বলিল , ‘ দাদা, আমার জন্য গাড়ি কিনতে যাচ্ছিস?’ বহুদিন হইতে তাহার ঠেলাগাড়িতে চড়িয়া হাওয়া খাইবার শখ হইয়াছে , কিন্তু কিছুতেই তাহা মিটিবার উপায় হইতেছে না । ছয় বৎসরের এক নাতিনি আসিয়া সরোদনে কহিল, পূজার নিমন্ত্রণে যাইবার মতো তাহার একখানি ও ভালো কাপড় নাই । 

রামসুন্দর তাহা জানিতে এবং সে সমন্ধে তামাক খাইতে খাইতে বৃদ্ধ অনেক চিন্তা করিয়াছেন । রায় বাহাদুরের বাড়ি যখন পূজার নিমন্ত্রণ হইবে তখন তাহার বধূগণকে অতি যৎসামান্য অলংকার অনুগ্রহপাত্র দরিদ্রের মতো যাইতে হইবে , এ কথা স্মরণ করিয়া তিনি অনেক দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়াছেন কিন্তু তাহাতে তাঁহার ললাটের বার্ধক্যরেখা গভীরতর অঙ্কিত হওয়া ছাড়া আর কোন ফল হয় নাই । 

দৈন্যপীড়িত গৃহের ক্রন্দনধ্বনি কানে লেইয়া বৃদ্ধ তাঁহার বেহাইবাড়িতে প্রবেশ করিলেন । আজ তাহার যে সংকোচভাব নাই ; দ্বাররক্ষী এবং ভৃত্যদের মুখের প্রতি সে চকিত সলজ্জ দৃষ্টিপাত দূর হইয়া গিয়াছে , যেন আপনার গৃহে প্রবেশ করিলেন । শুনিলেন , রায়বাহাদুর ঘরে নাই , কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিতে হইবে । মনের  উচ্ছ্বাস সংবরন করিতে না পারিয়া,  রামসুন্দর কন্যার সহিত সাক্ষাৎ করলেন । আনন্দে দুচোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল। বাপও কাঁদে , মেয়েও কাঁদে ; দুইজনের কেউ আর কথা কইতে পারে না । এমন করিয়া কিছুক্ষণ গেল।  তারপরে রামসুন্দর কহিলেন, ‘ এবার তোকে নিয়ে যাচ্ছি মা । আর কোন গোল নাই । 

এমন সময় রামসুন্দরের জৈষ্ঠপুত্র হরমোহন তাহার দুটি ছোট ছেলের সঙ্গে লইয়া সহসা ঘরে প্রবেশ করিলেন । পিতাকে বলিলেন , ‘ বাবা, আমাদের তবে এবার পথে ভাসালে?’ 

রামসুন্দর সহসা অগ্নিমূর্তি হইয়া বলিলেন, ‘ তোদের জন্য কি আমি নরকগামী হব । আমাকে তোরা আমার সত্য পালন করতে দিবি নে?’ রামসুন্দর বাড়ি বিক্রয় করিয়া বসিয়া আছেন ; ছেলেরা কিছুতে না জানিতে পায় তাহার অনেক ব্যবস্থা করিয়াছিলেন’  কিন্তু তবু তারা জানিয়েছে দেখিয়া তাহাদের প্রতি হঠাৎ অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া উঠিলেন । 

তাঁহার নাতি তাঁহার দুই হাটু সবলে জড়াইয়া ধরিয়া মুখ তুলিয়া কহিল, ‘ দাদা , আমাকে গাড়ি কিনে দিলে না?’ নতশির রামসুন্দরের কাছে বালক কোন উত্তর না পাইয়া নিরুর কাছে গিয়া কহিল , ‘ পিসিমা,  আমাকে একখানা গাড়ী কিনে দেবে ?’ 

নিরুপমা সমস্ত ব্যাপার বুঝিতে পারিয়া কহিল , ’বাবা’  তুমি যদি আর এক পয়সা আমার শ্বশুরকে দাও তাহলে আর তোমার মেয়েকে দেখতে পাবে না , এই তোমার গা ছুয়ে বললাম ।’ 

রামসুন্দর বলিলেন , ‘ ছি মা, অমন কথা বলতে নেই । আর এ  টাকাটা যদি আমি না নিতে পারি তাহলে তোর বাপেরও অপমান , আর তোরও অপমান । 

নিরু কহিল, ‘ টাকা যদি দাও তবেই অপমান । তোমার মেয়ের কি কোনো মর্যাদা নেই । আমি কি কেবল একটা টাকার থলি , যতক্ষণ টাকা আছে ততক্ষণ আমার দাম ! না বাবা , এ টাকা দিয়ে  তুমি আমাকে অপমান করো না । তাছাড়া আমার স্বামী তো এ টাকা চায় না।’

রামসুন্দর কহিলেন, ‘ তাহলে তোমাকে যেতে দেবে না, মা।’ 

নিরুপমা কহিল , ‘ না দেয় তো কি করবে বলো । তুমিও আর নিয়ে যেতে চেয়ো না।’ 

রামসুন্দর কম্পিত হস্তে নোটবাঁধা চাদরটি কাঁধে তুলিয়া আবার চোখের মতো সকলের দৃষ্টি এড়াইয়া বাড়ি ফিরিয়ে গেলেন । 

কিন্তু রামসুন্দর এই যে টাকা আনিয়েছেন এবং কন্যার নিষেধে সে টাকা না দিয়ে চলিয়া গিয়াছেন , সে কথা গোপন রইল না । কোন স্বভাবকৌতুহলী দ্বারলগ্নকর্ণ দাসী নিরুর শাশুড়িকে এই খবর দিল । শুনিয়া তাঁহার আর আক্রোশের সীমা রহিল না । 

নিরুপমার পক্ষে তাহার শ্বশুরবাড়ি শরশয্যা হইয়া উঠিল । এ দিকে তাহার স্বামী বিবাহের অল্পদিন পরেই ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হইয়া দেশান্তর চলিয়া গিয়াছে এবং পাছে সংসর্গদোষে হীনতা শিক্ষা হয় এই ওজরে সম্প্রতি বাপের বাড়ির আত্মীয়দের সহিত নিরুর সাক্ষাৎকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হইয়াছে । 

এই সময়ে নিরুর একটা গুরুতর পীড়া হইল  । কিন্তু সেজন্য তাহার শাশুড়িকে সম্পূর্ণ দোষ দেওয়া যায় না।  শরীরের প্রতি সে অত্যন্ত অবহেলা করিতো । কার্তিক মাসের হিমের সময় সমস্ত রাত মাথায় দরজা খোলা, শীতের সময় কাপড় নাই । আহারের নিয়ম নাই। দাসীরা যখন মাঝে মাঝে খাবার আনতে ভুলিয়া যায় তখন সে তাহাদের একবার মুখ খুলিয়া স্মরণ করাইয়া দেওয়া,  তাহাও সে করিত না । সে পরের ঘরের দাস-দাসী এবং কর্তাগৃহিণীদের উপর নির্ভর করে বাস করিয়াছে , এই সংস্কার তাহার মনে বদ্ধমূল হইয়াছিল । কিন্তু এরূপ ভাবাটাও শাশুড়ির সহ্য হইতো না । যদি আহারের প্রতিবছর বধূর কোন অবহেলা দেখিতেন তবে শাশুড়ি বলিতেন , ‘ দ্যাখো-না একবার , ছিরি হচ্ছে, দেখো না , দিনে দিনে যেন পোড়াকাট হয়ে যাচ্ছে। 

রোগ যখন গুরুতর হইয়া উঠিল তখন শাশুড়ি বলিলেন, ‘ ওর সমস্ত ন্যাকামি।’ অবশেষে একদিন নিরু সবিনয়ে শাশুড়িকে বলিল , ‘ বাবাকে আর আমার ভাইদের একবার দেখব , মা।’ 

শাশুড়ি বলিলেন , ‘ কেবল বাপের বাড়ি যাইবার ছল । 

কেউ বললে বিশ্বাস করবে না – সেদিন সন্ধ্যার সময় নিরুর শ্বাস উপস্থিত হইল সেই দিন প্রথম ডাক্তার দেখিল এবং সেইদিন ডাক্তারের দেখা শেষ হইল । 

বাড়ির বড় বউ মরিয়াছি,  খুব ধুম করিয়া অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পূর্ণ হইল।  প্রতিমা বিসর্জনের সমারোহ সম্বন্ধে জেলার মধ্যে রায়চৌধুরীদের যেমন লোকবিখ্যাত প্রতিপত্তি আছে , বড়বউদের সৎকার সম্বন্ধে রায়বাহাদুরদের তেমনই একটি খ্যাতির রটিয়া গেল – এমন চন্দনকাঠের চিতা  এ মুলুকে কেহ কথনও দেখে নাই । এমন ঘটা করিয়া শ্রাদ্ধও কেবল রায়বাহাদুরদের বাড়িতেই সম্ভব , এবং শোনা যায় ইহাতে তাহাদের কিঞ্চিৎ ঋন হইয়াছিল । 

রামসুন্দর কে সান্তনা দেবার সময়,  তাহার মেয়ের যে কিরূপ মহাসমারোহে মৃত্যু হইয়াছে,  সকলেই তাহার বহুল বর্ণনা করিল । 

এদিকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের সিটি আসিল, ‘  আমি এখানে সমস্ত বন্দোবস্ত করিয়া লইয়াছে,  অতএব অবিলম্বে আমার স্ত্রীকে এখানে পাঠেইবে ।’ রায়বাহাদুরের মনীষী লিখেছেন , ‘ বাবা তোমার জন্যে আর- একটি মেয়ের সমন্ধে করিয়াছি,  অতএব অবিলম্বে ছুটি লইয়া-এখানে আসবে ।’ 

এবারে বিশ হাজার টাকা পন এবং হাতে হাতে আদায় । 

শব্দার্থ ও টীকা :

রায়বাহাদুর-  ব্রিটিশ আমলের সরকারি খেতাব ,রাজার মত সম্ভ্রন্ত ও প্রতাপশালী ব্যক্তি । তুমুল- প্রবল, ঘোরতর, ভয়ানক । অনুরাগ- আসক্তি , প্রীতি, সোহাগ , মমতা । হতোদ্যম- নিরূদ্যম, উদ্যমহীন । প্রতিপত্তি – সম্মান ,মর্যাদা ,প্রভাব । খোঁটা- গঞ্জনা, নিন্দা, দোষের প্রতি ইঙ্গিত । নিত্যক্রিয়া – দৈনিন্দিন কর্ম , প্রতিদিনের কাজ । আক্রোশ- বিদ্বেষ, ক্রোধ । ঝংকার – গুঞ্জন, বীণা ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের শব্দ । দয়াপরতন্ত্র – দয়ার্দ্র, দয়ার বশীভূত । আজগুবি- অদ্ভুত,  অবিশ্বাস্য । পঞ্জর- পাঁজর, বুকের হাড়ের খাঁচা । সরোদনে- কেঁদে কেঁদে । স্বভাবকৌতুহলী দ্বারলগ্নকর্ণ – আড়ালে অবস্থান করে অন্যের কথোপকথন শোনা । শরশয্যা- মৃত্যুশয্যা । বন্দোবস্ত- ব্যবস্থা, আয়োজন । 

পাঠ-পরিচিতি :

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গল্পগুচ্ছ ’ থেকে দেনাপাওনা গল্পটি সংকলিত হয়েছে । নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের রামসুন্দর পাঁচ পুত্র এবং এক কন্যার জনক । আদরের কন্যার প্রতাপশালী রায়বাহাদুরের একমাত্র পুত্রের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয় । বিয়ের সময় পাত্রের পিতা রায়বাহাদুর দশ হাজার টাকা নগদ সহ অন্যান্য সামগ্রী বিয়ের যৌতুক হিসেবে দাবি করেন । কন্যার বাপ রাজি হন বিয়ের সময় নগদ অর্থ বাকি পড়ে যায় । শুরু হয় পিতা ও কন্যার উপর মানসিক নির্যাতন । আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আমাদের সমাজের এই ভয়াবহ ব্যাধির কাহিনী । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দরদী হাতে গল্পের কাহিনী আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে এবং যারা যৌতুক গ্রহণ করে তাদের প্রতি এক ধরনের ঘৃণার জন্ম দেয় । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

64 ÷ = 8