নিয়তি

      হুমায়ূন আহমেদ 

আমার শৈশবের অদ্ভুত স্বপ্নময় কিছু দিন কেটেছে জগদলে । জগদলের দিন আনন্দময় হবার অনেকগুলো কারণের প্রধান কারণ স্কুলের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি । সেখানে কোন স্কুল নেই । কাজেই পড়াশুনার যন্ত্রণা নেই । মুক্তির মহানন্দ । 

আমরা থাকি এক মহারাজার বসতবাড়িতে , যে-বাড়ির মালিক অল্প কিছুদিন আগেই দেশ ছেড়ে ইন্ডিয়াতে চলে গেছেন । বাড়ি চলে এসেছে পাকিস্তান সরকারের হাতে । মহারাজার বিশাল এবং প্রাচীন বাড়ির একতলায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা । দোতলাটা তালাবদ্ধ । শুধু দুতলা নয় , কয়েকটা ঘর ছাড়া বাকি সবটা তালাবদ্ধ , কারণ মহারাজা জিনিসপত্র কিছুই নিয়ে যায় নি । ঐসব ঘরে তাঁর জিনিসপত্র রাখা । 

ঐ মহারাজার নাম আমার জানা নেই । মাকে জিজ্ঞেস করিলাম, তিনিও বলতে পারলেন না । তবে তিনি যে অত্যান্ত ক্ষমতাশালী ছিলেন তাঁর অসংখ্য প্রমাণ এই বাড়িতে ছড়ানো । জঙ্গলের ভেতর বাড়ি । সেই বাড়িতে ইলেকট্রিসিটির ব্যবস্থা করার জন্য তার ছিল নিজস্ব জেনারেটর । দাওয়াতের চিঠি ছেপে  পাঠানোর জন্য মিনি সাইজের একটা ছাপাখানা । 

বাবাকে অসংখ্যবার বলতে শুনেছি-  মহারাজার রুচি দেখে মুগ্ধ হতে হয় । আহা, কত বই ! কত বিচিত্র ধরনের বই । 

বিকেলগুলোও কম রোমাঞ্চকর ছিল না। প্রতিদিনই বাবা কাঁধে গুলিভরা বন্দুক নিয়ে বলতেন – চল বনে বেড়াতে যাই । কাঁধে বন্দুক নেওয়ার কারণ হচ্ছে প্রায়ই বাঘ বের হয় । বিশেষ করে চিতাবাঘ । 

বাবার সঙ্গে সন্ধ্যা পর্যন্ত বনে ঘুরতাম । ক্লান্ত হয়ে ফিরলাম রাতে ।  ভাত খাওয়ার আগেই ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসত । কত বিচিত্র শব্দ আসতো বন থেকে । আনন্দে এবং আতঙ্কে শিউরে শিউরে উঠতাম । 

একদিন কাঁপুনি দিয়ে আমার এলো জ্বর । বাবা-মা দুজনেই মুখ শুকিয়ে গেল-  লক্ষণ ভালো নয় । নিশ্চয়ই ম্যালেরিয়া । সেই সময়ে এই অঞ্চলে ম্যালেরিয়া কুখ্যাত ছিল । একবার কাউকে ধরলে তার জীবনীশক্তি পুরোপুরি নিঃশেষ করে দিত । ম্যালেরিয়ার মৃত্যু ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার । আমরা প্রতিষেধক হিসেবে বায়োকেমিক ওষুধ ছাড়াও প্রতি রবিবার পাঁচ গ্রেন করে কুইনাইন খাচ্ছি । তার পরও ম্যালেরিয়া ধরবে কেন ? 

বাবা এই ভয়ংকর জায়গা থেকে বদলির জন্য চেষ্টা- তদবির করতে লাগলেন । শুনে আমার মন ভেঙ্গে গেল । এত সুন্দর জায়গা, এমন চমৎকার জীবন – এসব ছেড়ে কোথায় যাব ? ম্যালেরিয়ার মরতে হলেও এখানেই মরব । তাছাড়া ম্যালেরিয়া অসুখটা আমার বেশ পছন্দ হলো । যখন জ্বর আসে তখন কি প্রচণ্ড শীতই- না  লাগে ! শীতের জন্যেই বোধহয় শরীরে এক ধরনের আবেশ সৃষ্টি হয় । জ্বর যখন বাড়তে থাকে তখন চোখের সামনের প্রতিটি জিনিস আকৃতিতে ছোট হতে থাকে  । দেখতে বড় অদ্ভুত লাগে । এক সময় নিজেকে বিশাল দৈত্যের মতো মনে হয় । কী আশ্চর্য অনুভুতি ! 

শুধু আমি একা নই, পালা করে আমরা সব ভাইবোন জ্বরে পড়তে লাগলাম । 

একজন জ্বর থেকে উঠতেই অন্যজন জ্বরে পড়ে । জ্বর আসেও খুব নিয়মিত । আমরা সবাই জানি কখন জ্বর আসবে । সেই সময়ে লেপ-কাঁথা গায়ে জড়িয়ে আগেভাগেই বিছানায় শুয়ে পড়ি । 

প্রতিদিন ভোরে তিন ভাইবোন রাজবাড়ির মন্দিরের চালাতে বসে রোদ গায়ে মাখি । এই সময় আমাদের সঙ্গ দেয় বেঙ্গল টাইগার । বেঙ্গল টাইগার হচ্ছে আমাদের কুকুরের নাম । না, আমাদের কুকুর নয় , মহারাজার কুকুর।  তার নাকি অনেকগুলো কুকুর ছিল । তিনি সবকয়টাকে নিয়ে যান , কিন্তু এই কুকুরটিকে নিতে পারেন নি । সে কিছুতেই রাজবাড়ী ছেড়ে যেতে রাজি হয় নি । 

মা তাকে দুবেলা খাবর দেন । মাটিতে খাবার ঢেলে দিলে সে খায় না । থালায় করে দিলে হয় । শুধু তা-ই না , খাবার দেবার পর তাকে মুখে বলতে হয় – খাও । 

খানদানি কুকুর । আদব-কায়দা খুব ভালো । তবে বয়সের ভারে সে কাবু  । সারাদিন বাড়ির সামনে শুয়ে থাকে  । হাই তোলে , ঝিমুতে ঝিমুতে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে । 

এক ভোরবেলার কথা । আমার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে । আমি কম্বল গায়ে দিয়ে মন্দিরের চালাতে বসে আছি । আমার সঙ্গে শেফু এবং ইকবাল । মা এসে আমাদের মাঝখানে শাহীনকে ( আমার ছোট ভাই)  ছোটভাই বসিয়ে দিয়ে গেলেন । আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তার দিকে নজর রাখা , যে  যেন হামাগুড়ি দিয়ে চাতাল থেকে পড়ে না যায় । 

মা চলে যাওয়ার পরপরই হিসহিস শব্দে পেছনে ফিরে তাকালাম । যে- দৃশ্য দেখলাম সে-দৃশ্য দেখার জন্য মানসিক প্রস্তুতি আমার ছিল না । মন্দিরের বন্ধ দরজার ফাঁক দিয়ে প্রকাণ্ড একটা কেউটে সাপ বের হয়ে আসছে । মাটির ছুঁয়ে ছুঁয়ে আছে । ফণা  তুলে এদিক-ওদিক দেখছে , আবার মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসছে, আবার ফণা তোলে । আমরা তিন ভাইবোন ছিটকে সরে গেলাম । শাহীন একা বসে রইল, সাপ দেখে তাঁর আনন্দের সীমা নেই। যে চেষ্টা করেছে সাপটির দিকে এগিয়ে যেতে । আর তখনই বেঙ্গল টাইগার ঝাঁপিয়ে পড়ল সাপটির ওপর ।ঘটনা এত দ্রুত ঘটল যে আমরা কয়েক মুহূর্তে বুঝতে পারলাম না কি হচ্ছে । একসময় শুধু দেখলাম কুকুরটা সাপের ফণা কামড়ে ছিঁড়ে ফেলেছে । বেঙ্গল টাইগার ফিরে যাচ্ছে নিজের জায়গায় । যেন কিছুই হয়নি । নিজের স্বাভাবিক কর্মকান্ড সে শেষ করল । 

সাপ কুকুরটিকে কামড়াবার সুযোগ পেয়েছিল কি না জানি না । সম্ভবত কামড়ায়নি । কারণ কুকুরটি বেঁচে রইল , তবে নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিল । দ্বিতীয় দিনে তার চামড়া খসে পড়ল এবং দগদগে ঘা দেখা দিল । এ থেকে মনে হয় সব সম্ভবত কামড়েছে । সাপের বিষ কুকুরের ক্ষেত্রে হয়তো তেমন ভয়াবহ নয় । 

আরোও দুদিন কাটলো । কুকুরটি চোখের সামনে পচেগলে যাচ্ছে । তার কাতরধ্বনি সহ্য করা মুশকিল । গা থেকে গলিত মাংসের দুর্গন্ধ আসছে 

বাবা মাকে ডেকে বললেন , আমি এর কষ্ট সহ্য করতে পারছি না । তুমি বন্দুক বের করে আমাকে দাও  । বাবা আমাদের চোখের সামনে পরপর দুটি গুলি করে কুকুরটিকে মারলেন । আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম বাবা দুঃখে বেদনায় কুঁকড়ে উঠেছেন । তবু শান্ত গলায় বললেন, যে আমার ছেলের জীবন রক্ষা করেছে তাকে আমি গুলি করে মারলাম । একে বলি নিয়তি । 

কিন্তু আমার কাছে বাবাকে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম মানুষদের একজন বলে মনে হলো । নিজেকে কিছুতেই বোঝাতে পারছিলাম না এমন একটি কাজ তিনি কি করে করতে পারলেন  । রাগে, দুঃখে ও অভিমানে রাতে ভাত না খেয়ে শুয়ে পড়েছি । বাবা আমাকে ডেকে নিয়ে বারান্দায়  বসালেন । 

দুজন চুপচাপ বসে আছি । চারদিকে ঘন অন্ধকার । তক্ষক ডাকছে । বাড়ির চারপাশের আমের বনে হাওয়া লেগে বিচিত্র শব্দ উঠছে । 

বাবা কিছুই বললেন না। হয়তো অনেক  কিছুই তাঁর মনে ছিল । মনের ভাব প্রকাশ করতে পারলেন না । একসময় বললেন , যাও ঘুমিয়ে পড়ো । আমি সেদিন বুঝতে পারিনি বাবা কেন কুকুরটিকে এভাবে মেরে ফেলেছিল ! 

  কুকুরটি আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল । 

শব্দার্থ ও টীকা :

অদ্ভুত – চমৎকার,  অসাধারণ । মহানন্দ-  গভীর আনন্দ , অনেক আনন্দ । আবেশ- ভাবাবেগ, অনুরাগ, এখানে এক ধরনের মানসিক প্রতিক্রিয়া বুঝানো হয়েছে । চাতাল- উঠান, শান বাঁধানো বসার জায়গা । তক্ষত- এক ধরনের অত্যন্ত বিষধর সাপ । 

পাঠ-পরিচিতি :

বাংলাদেশের নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ “ আমার ছেলেবেলা ‘ থেকে ‘ নিয়তি ‘ নামক গল্পটি সংকলিত হয়েছে । লেখকের ছোটবেলায় বাবার চাকরিসূত্রে  জগদলের একটি পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িতে অবস্থানকালীন স্মৃতি এবং তার অনুভূতি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী বলে এখানে বর্ণনা করা হয়েছে । জমিদারবাড়ির কুকুরটি লেখকদের ছোট ভাইকে কেউটে সাপের ছোবল থেকে রক্ষা করে । সাপটিকে মেরে ফেললেও কুকুরটিও সাপের কামড় খায় । সাপের কামড়ের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত কুকুরটির পরবর্তী যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তার বাবা কুকুরটিকে গুলি করে মেরে ফেলেন । কুকুরের এই নিয়তি তার বালক চিত্তে বেদনায় সঞ্চার করে । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

− 2 = 8