টিউডর বংশের সূচনা

টিউডর বংশের উৎপত্তি বা আদি পরিচয় :

ইংল্যান্ডের ওয়েলসে ওয়েন টিউটর নামে একজন নাইট ছিলেন । এ টিউটর পরিবার থেকে ইংল্যান্ডের টিউডর রাজবংশের উৎপত্তি হয় । ওয়েন টিউটর ল্যাস্কাস্টার বংশীয় রাজা পঞ্চম হেনরির বিধবা পত্নী ক্যাথারিনকে বিবাহ করেন । তার দুই পুত্র ছিল । তাদের নাম ছিল এডমান্ড টিউডর ও জেস্-পার টিউডর । তারা তাদের বৈপিত্রেয় ভাই রাজা ষষ্ঠ হেনরি কর্তিক যথাক্রমে রিচমন্ড ও পেমব্রোকের আর্ল পদে অধিষ্ঠিত হন । এডমান্ড টিউডর ল্যাস্কাস্টার বংশীয় সোমারটের  ডিউকের কন্যা লেডি মার্গারেট বুর্ফোর্টরেক বিবাহ করেন । তাদেরই একমাত্র সন্তান রিচমন্ডের আর্ল হেনরী টিউডর ইংল্যান্ডের টিউডর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা । ইংল্যান্ডের সিংহাসনে আহরণ করে তিনি সপ্তম হেনরি উপাধি গ্রহণ করেছিলেন । 

টিউডর যুগের ( ইউডার শাসনামলের ) প্রধান বৈশিষ্ট্য সমূহ : 

প্রথমত , ইংল্যান্ডের টিউটর শাসনকালের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এই যে , এ যুগে ইংল্যান্ডে একটি অত্যান্ত শক্তিশালী রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠিত হয় । টিউডর রাজাগণ বিভিন্ন পন্থায় সমস্ত শক্তিকে কঠোরভাবে দমন এবং প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করে , নতুন নতুন কার্যকরী কেন্দ্রীয় সংগঠন ও বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন বিচারালয় প্রতিষ্ঠা করে এবং শাসন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদ সমূহের অনুগত ও বিশ্বস্ত লোক নিয়োগ করে ‘ টিউডর স্বৈরতন্ত্র ‘ বা ‘ নতুন রাজতন্ত্র’ নামে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন । 

দ্বিতীয়ত, টিউডর শাসনামলেই পরবর্তীকালে শক্তিশালী মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের জন্ম ও প্রতিপালন হয়েছিল । টিউডর শাসকগণ ইচ্ছাকৃতভাবে সামন্ত প্রভুগনকে যথাসম্ভব বর্জন করে বিত্তবান ব্যবসায়ী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শিক্ষিত ও প্রতিভাবান ব্যক্তিগণকে শাসন বিভাগের উচ্চ পদে নিযুক্ত এবং পালামেন্টের অন্তর্ভুক্ত করতেন । ফলে মধ্যবিত্তরাই ক্রমান্বয়ে দেশের ও জাতির মেরুদন্ড পরিণত হয়েছিল।  

তৃতীয়ত, টিউটরের যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল , পার্লামেন্টে এ  যুগের ধীরে ধীরে ও নীরবে শক্তি সঞ্চয় করেছিল । টিউটর রাজাগণ পার্লামেন্টারি বিশেষ পরিবর্তন সাধন করেছিলেন । যদিও এ পরিবর্তন পূর্ণাঙ্গ ছিল না , তথাপি পার্লামেন্ট এ সময়ে এমন সব ক্ষমতা লাভ করতে আরম্ভ করেছিল যা মধ্যযুগীয় পালামেন্টের চিন্তার অতীত ছিল । 

চতুর্থত , টিউডর যুগের আরেকটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল রেনেসাঁ বা রিফর্মেশন । এদুটি যুগান্তকারী ঘটনা টিউটর যুগের ইংল্যান্ডের সংঘটিত হয় । রেনেসাঁ আন্দোলনের প্রভাব সপ্তম হেনরি রাজত্বকালে ইংল্যান্ডে অনুপ্রবেশ করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছিল এবং মানুষের চিন্তার জগৎকে বৈপ্লবিক পরিবর্তন করে তাদের ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার গ্রহণের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তুলেছিল । পরবর্তী রাজত্বকালে সংঘটিত ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের ভিত্তিভূমি ছিল এ রেনেসাঁ । অন্যদিকে , রিফর্মেশন ইংল্যান্ডের ধর্মীয় জীবনে এমন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনায়ন করেছিল যার ফলে ইংল্যান্ডের চার্চ রোমীও চার্চ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন জাতীয় চার্চে পরিণত হয়েছিল । 

পঞ্চমত , এ যুগে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে ভৌগলিক আবিষ্কার এবং বহি বাণিজ্য সম্প্রসারণে যুগ ছিল । প্রথম টিউটর রাজার সপ্তম হেনরি রাজত্বকাল থেকেই ইংরেজ নাবিক বণিক-গণ সমুদ্রপথে নতুন আবিষ্কারের অংশগ্রহণ করে আমেরিকার মূল ভূখন্ড ও বহু অজ্ঞাত প্রদেশে উপস্থিত হন । একসময় ভৌগোলিক আবিষ্কার বা সামুদ্রিক অভিযান এর ফলে আটলান্টিকের মধ্য দিয়ে আমেরিকা বা এশিয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উন্মুক্ত হয় । আটলান্টিকের পথ উন্মুক্ত হবার পর থেকেই এবং নাবিকদের ক্রমবর্ধমান আবিষ্কারের ফলে ইংল্যান্ডের গুরুত্ব অভাবনীয় রূপে বৃদ্ধি পেতে থাকে ।কারণ , এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ ক্রমশ ইংল্যান্ডের প্রায় দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয় । অনুকূল ভৌগলিক পরিস্থিতির ফলে বহির্বাণিজ্য ইংল্যান্ড প্রধান স্থান অধিকার করতে আরম্ভ করে । ইংল্যান্ডের নাবিক ও বণিকগণ ভূমধ্যসাগরের সংকীর্ণ পথ পরিত্যাগ করে মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ব্রিটিশ বাণিজ্য বিভিন্ন দ্রব্য বিভিন্ন  দেশে নিয়ে গিয়ে সে সকল দেশের বাজার দখল করে বসে এবং বিদেশের সাথে ব্যবসা বাণিজ্য করার জন্য বিভিন্ন ব্যবসায়ী কোম্পানি গঠন করেন । এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে মাস্কোভী কম্পানি , লেভান্ট কোম্পানি ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । 

ষষ্ঠত, এযুগের ইংল্যান্ড নেী শক্তিতে প্রাধান্য স্থাপনে এবং ঔপনিবেশিক আধিপত্য বিস্তারে আত্মনিয়োগ করে । সমুদ্রে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা , বহি বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আমেরিকায় ইংল্যান্ডের অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে দুর্ধর্ষ ইংরেজ নাবিক বণিক-গণ সমুদ্রপথে স্পেনের পণ্যবাহী ও স্বর্ণ বাহী জাহাজ লুণ্ঠন করে এবং স্পেনীয় আমেরিকায় বলপূর্বক পণ্যদব্য ও ক্রীতদাস  রপ্তানি করে স্পেনের সাথে  সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়ে ।পরিশেষে , সংঘর্ষে স্পেনের ‘ অজেয় নেীবহর ‘ ইংল্যান্ডের হাতে সাংঘাতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়  এবং সমুদ্রবক্ষে ইংল্যান্ডের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা হয় । সামুদ্রিক অভিযান এবং বহি বাণিজ্য প্রসারে ইংরেজগনকে বিভিন্ন দেশে উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদের সুযোগ দিয়েছিল । উদাহরণস্বরূপ , রানী এলিজাবেথের রাজত্বকালে প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিই পরবর্তীকালে ভারতীয় উপমহাদেশের সুবিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল । 

সপ্তমত, এ যুগে রাজসরকার, পার্লামেন্ট ও সাধারণ আইন এ  তিনটি রাষ্ট্রীয় শক্তির মধ্যে ঐক্য বিদ্যমান ছিল । এ সময়ে এ তিনটি মধ্যে প্রাধান্য নিয়ে কোনরুপ বৈরিতা বা বিরোধ সৃষ্টি হয়নি এবং কোন মৌলিক শাসনতান্ত্রিক প্রশ্ন দেখা দেয় নি । রাষ্ট্রের মধ্যে সার্বভৌমত্বের অবস্থান নিয়ে কেউই এ সময় কোন প্রশ্ন উত্থাপন করেন নি । 

পরিশেষে , টিউডর শাসনকালে শিক্ষার নবজাগরণ , ধর্ম সংস্কার , জাতীয়তাবাদের উন্মেষ , মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আর্বিভাব , ভৌগলিক আবিষ্কার ইত্যাদি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মধ্যযুগের অবসান ও আধুনিক যুগের সূচনা হয় । 

টিউডর রাজত্বের প্রাক্কালে অথবা ( সপ্তম হেনরি সিংহাসনারোহণ কালে ) ইংল্যান্ডের অবস্থা : 

টিউডর রাজত্বের প্রাক্কালে ইংল্যান্ডের অবস্থা সকল দিক দিয়েই শোচনীয় ছিল । দীর্ঘ ত্রিশ বছর যাবৎ গৃহযুদ্ধের ফলে ইংল্যান্ডে একটি সাম্রাজ্যচ্যুত  দুর্বল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল এবং ওর ক্রেসী ও এগিনফোর্ট বিজয়ের গৌরব অন্তর্হিত হয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ওর খ্যাতি ও গুরুত্ব একেবারে লোপ পেয়েছিল । একমাত্র ক্যালাইস ছাড়া ইউরোপের আর কোন ভূখণ্ড তখন ইংল্যান্ডের অধিকার ছিল না । সুতরাং এ সময় ফান্স, স্পেন , অস্ট্রিয়া,  তুরস্ক প্রকৃতির মতো শক্তিশালী ইউরোপীয় রাষ্ট্র সমূহের পাশে ইংল্যান্ডের কোন স্থান ছিল না । সাম্রাজ্যচ্যুত , আত্মকলহে দুর্বল ইংল্যান্ডকে আয়ারল্যান্ড , স্কটল্যান্ড , ফ্লন্ডার্স প্রভৃতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশগুলোও গ্রাহ্য করত না । স্কটল্যান্ড ছিল চির শত্রু এবং আয়ারল্যান্ডের উপরে ইংল্যান্ডের আধিপত্য ছিল নামে মাত্র । 

ইংল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ অবস্থাও সমানভাবে নৈরাজ্যজনক ছিল । রাজার শাসন বা কৃতিত্ব দেশ থেকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে লোপ পেয়েছিল । এগিনফোর্ট বিজয়ী  রাজা পঞ্চম হেনরীর পরে ইংল্যান্ডের আর কোন মধ্যযুগীয় রাজা শক্তিশালী সামন্তগণকে সংযত করতে সক্ষম হয়নি । ফলে তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই ইংল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ গোলযোগ শুরু হয় । তার পুত্র রাজা ষষ্ঠ হেনরির রাজত্বের শেষভাগে আত্মকলহ চরম আকার ধারণ করে এবং পরিণামে ‘ গোলাপের যুদ্ধ ‘ নামে এক দীর্ঘস্থায়ী ও আত্মঘাতী গৃহযুদ্ধের সূচনা হয় । এ যুদ্ধের ফলে পার্লামেন্টেও শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয় । দেশের সর্বত্রই ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং রাজশক্তির শোচনীয় রূপে দুর্বল হয়ে পড়ে । রাজার হাতে কার্যত কোনো ক্ষমতাই ছিল না । শক্তিশালী সামন্ত প্রভুগন  রাজ ক্ষমতা সম্পন্ন রূপে গ্রাস করেন । শাসন ব্যবস্থার সর্বত্রই রাজার পরিবর্তে তাদের কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় , তাদের হাতেই ছিল পার্লামেন্ট , সৈন্যদল , বিচারক ও জুরি । সুতরাং সাধারণ লোককে নির্ভর করতে হতো তাদের অনুগ্রহের উপর । সামন্তগন সর্বেসর্বা হয়ে শীঘ্রই অশান্তি ও অত্যাচারে সমগ্র দেশকে অতিষ্ঠ করে তুলে । দেশের যে আইন প্রচলিত ছিল , সামন্তগন তা অগ্রাহ্য করবার ক্ষমতা রাখতেন । তারা নিজের শহর সৈন্যবাহিনী বা লাঠিয়ালদের সাহায্যে আইন ভঙ্গ করতেন এবং যখন তখন যুদ্ধ-বিগ্রহ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করতেন । অভিযুক্ত হলে তারা তাদের ব্যক্তিগত সশস্ত্র অনুচরগণসহ আদালতে উপস্থিত হয়ে বিচারক ও জুরিদিগকে ভীতি প্রদর্শন করে স্বপক্ষে রায় আদায় করতেন । ফলে , দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে ; ব্যবসা বাণিজ্য , শিল্প ও কৃষিকার্য চরম দুর্গতির সম্মুখীন হয় এবং সাধারন লোক সীমাহীন দুর্দশায় পতিত হয় । 

শক্তিশালী শাসন ও সুসংহত আইনের অভাবে জনসাধারণের সামাজিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে । দস্যু ও তস্করের উপদ্ররেব জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠে ; নিরীহ লোক প্রকাশ্য দিবালোকে ছাড়া একাকী রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে পারত না । 

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

46 − = 41