পদার্থ কাকে বলে – বস্তুর সমষ্টিকরণ অবস্থা

ভূমিকা:

ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য যেকোন বস্তু , যাহার ওজন আছে , যাহা কোন পরিমাণ স্থান দখল করিয়া অবস্থান করে এবং যাহার প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে তাহাকে পদার্থ বলে । পদার্থ তিন অবস্থায় থাকতে পারে । যথা : – কঠিন তরল ও গ্যাসীয় বা বায়োবীয় । কোন বিশেষ অবস্থায় একটি পদার্থ একই সঙ্গে তিন অবস্থাতেই বিরাজ করতে পারে । উদাহরণস্বরূপ বলা যায় , পানির গলনাঙ্ক কে কঠিন বরফ , তরল পানি ও পানি বাষ্প একই সঙ্গে অবস্থান করে ।

সাধারণ বায়ুচাপের যে পদার্থের স্ফুটনাঙ্ক কক্ষ তাপমাত্রা চেয়ে নিম্ন তাকে গ্যাস , যে পদার্থের গলনাঙ্ক কক্ষ তাপমাত্রায় চেয়ে নিম্ন তাকে তরল এবং যে পদার্থের গলনাঙ্ক কক্ষ তাপমাত্রা চেয়ে উচ্চ তাকে কঠিন পদার্থ বলা হয় ।

যখন কোন কঠিন পদার্থ তরল পদার্থে বা কোন তরল পদার্থ গ্যাসীয় পদার্থের পরিবর্তিত হয় তখন তাপের শোষণ করে । ইহা হইতে বুঝা যায় যে , কোন নির্দিষ্ট পরিমাণ পদার্থ তরল বা কঠিন অবস্থার চাইতে গ্যাসীয় অবস্থায় অধিক পরিমান শক্তি ধারণ করে ।

পদার্থ কাকে বলে।

যার ভর আছে , আয়তন আছে এবং স্থান দখল করে এবং বলপ্রয়োগে কিছু না কিছু পরিমাণ প্রতিরোধ সৃষ্টি করে , তাকে পদার্থ বলে । পদার্থ মূলত তাপমাত্রা ও চাপের উপর নির্ভর করে । চক , ডাস্টার, চেয়ার , টেবিল ইত্যাদি পদার্থ ।

অথবা, পদার্থ বলতে সেই সমস্ত উপাদানকে বুঝায় , যার ভর আছে , জড়তা আছে এবং বল প্রয়োগে বাধা প্রদান করে ।

পদার্থের বৈশিষ্ট্যবলি:

পদার্থের বৈশিষ্ট্য হল পদার্থের সাধারণ ধর্ম যা দ্বারা পদার্থকে অনুধাবন করা যায়। নিম্নে পদার্থের কিছু বৈশিষ্ট্য দেওয়া হলঃ

১) স্থান দখল : পদার্থ মাত্রেই কিছু স্থান দখল করে থাকে।

২) ভর : কোন বস্তুর ভিতর পদার্থের পরিমাণকে তার ভর বলে । ভর হলো বস্তুর মৌলিক বৈশিষ্ট্য যার কারণে মহাকর্ষ বলের উদ্ভব হয় ।

৩) পরিসর: পদার্থের দৈর্ঘ্য , প্রস্থ ও বেধ আছে অর্থাৎ এর পরিসর বা আকৃতি আছে ।

৪) জড়তা: পদার্থ তার অবস্থা বজায় রাখতে চায়, অর্থাৎ গতিশীল বস্তুর গতি থাকতে চায় এবং স্থিতিশীল বস্তুর স্থিতিশীল থাকতে চায় । অর্থাৎ জড়তা হলো নিজের অবস্থাকে বজায় রাখার চেষ্টা ।

৫) স্থানান্তরশীল: প্রয়োজনীয় বল বা চাপ প্রয়োগে পদার্থের স্থান পরিবর্তন করে ।

৬) বিভাজ্যতা : পদার্থকে ক্রমান্বয়ে ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতর বিভক্ত করা যায় , তথাপি এর ধর্মেও কোন পরিবর্তন হয়না ।

৭) সীমা: প্রতিটি পদার্থের একটি নির্দিষ্ট সীমা বিদ্যমান । হিমাবাহ পরিষদের কারণে প্রতিটি বস্তুর ও একটি নির্দিষ্ট আয়তন বিদ্যমান ।

পদার্থের গঠন :

সকল পদার্থ কতগুলো ছোট ছোট কণার সমন্বয়ে গঠিত । এ ছোট ছোট কণাগুলোকে অনু , পরমাণু বা আয়ন বলে । অনু-পরমানু বা আয়ন আকারে এতই ছোট যে এদেরকে খালি চোখে দেখা যায় না , বরং খালি চোখে দেখা যায় পদার্থের এরকম একটি ক্ষুদ্রতম অংশ প্রায় একশত লক্ষেরও বেশি কনা বিদ্যমান থাকে । প্রকৃতপক্ষে পদার্থের ভৌত অবস্থা ও ধর্ম এ ছোট ছোট কণাগুলোর প্রকৃতির উপর নির্ভর করে ।

পদার্থের গঠন এসব কণার সন্নিবেশের ধরন অনুসারে তাপমাত্রা ও চাপ এর পরিবর্তনে পদার্থ প্রধানত তিনটি অবস্থার ধারণ করে । আবার পদার্থ অনু অথবা পরমাণু কিংবা বিপরীত চার্জিত আয়নের সমাবেশ ।

পদার্থের বিভিন্ন অবস্থা :

পদার্থ সাধারণত তিন অবস্থায় থাকতে পারে । যথা –

১) কঠিন অবস্থা

২) তরল অবস্থা

৩) গ্যাসীয় বা বায়োবীয় অবস্থা ।

কঠিন অবস্থা :

একটি কঠিন পদার্থের অণুর সমূহ স্ফটিক ল্যাটিসে নির্দিষ্ট স্থানের দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকে । উচ্চ আকর্ষণ শক্তির প্রভাবে অণুগুলো একে অন্যের খুব কাছাকাছি থাকে এবং এই জন্য তাদের মধ্যে খুব সামান্য শূন্যস্থান থাকে বা মোটেও কোনো শূন্যস্থান থাকে না । ফলে অণুসমূহের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কোন স্থানান্তর ঘটিত বা ঘূর্ণন পরিলক্ষিত হয় না । উহারা শুধুমাত্র তাদের নির্দিষ্ট অবস্থানে এদিক-ওদিক কম্পন করিতে পারে । সুতরাং কঠিন পদার্থের নির্দিষ্ট আয়তন থাকে । আকৃতি বিনষ্টকারী শক্তিকে বা প্রবর্তিত চাপকে ইহার সজোরে বাধা দান করতে পারে বলিয়া কঠিন পদার্থের নির্দিষ্ট আকার থাকে ।

তরল অবস্থা :

কোন তরলে উহার অণুসমূহ যথেষ্ট দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকে না । তরলে অণুসমূহের নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান এর জন্য আকর্ষণজনিত আণবিক শক্তি কঠিনের ন্যায় ততবেশি প্রবল নয় , এইজন্য তরলের কোন নির্দিষ্ট আকার নেই । যখন যে পাত্রে রাখা হয় তরল সেই পাত্রের আকার ধারন করে । যদিও কঠিন এর চাইতে উপহার আন্তঃআণবিক শক্তি কম তথাপি এই শক্তি অণুসমূহের বিচ্ছিন্নতা প্রতিহত করতে সক্ষম বলিয়া তরলের নির্দিষ্ট আয়তন থাকে ।

সংক্ষেপে বলা যায় , তরল পদার্থের নির্দিষ্ট আয়তন আছে , কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই ।

যেহেতু আন্তঃআণবিক শক্তি কঠিনের চাইতে তরলে কম , কাজেই অণুসমূহের মধ্যে শূন্যস্থান কঠিনের চাইতে তরলে বেশি । সুতরাং তরলে কম্পনজনিত গতি এর সঙ্গে ঘূণূনজনিত গতিও আছে । ইহা ছাড়া তরলে স্থানান্তরঘটিত গতিও কিছু পরিমাণে সৃষ্টি হয় ।

যদিও কঠিন এর তুলনায় তরলের আন্তঃআণবিক শূন্যস্থান বেশি তথাপি গ্যাসের আন্তঃআণবিক শূন্যস্থানের চাইতে খুবই কম । এইজন্য তাপ ও চাপের পরিবর্তনের তরলের আয়তন খুব সামান্য পরিমাণে পরিবর্তিত হয় । প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ১,৫০,০০০ পাউন্ড চাপ প্রয়োগ করিয়া পানিকে সংকুচিত করিলেই ইহার আদি আয়তনের মাত্রা ১/৫ ভাগ হ্রাস পায় । কিন্তু এই পরিমাণ চাপ প্রয়োগে কঠিনের আয়াতনে আদৌ কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ করা যায় না । কঠিন ও তরলকে অনেক সময় ঘনীভূত দশা বলা হয় ।

গ্যাসীয় অবস্থা :

গ্যাসের ক্ষেত্রে আন্তঃআণবিক শক্তি খুবই কম , গ্যাসে আন্তঃআণবিক শূন্যস্থান খুব বেশি এবং গ্যাসের অণুর তিন ধরনের গতিই অর্থাৎ স্থানান্তরঘঠিত , ঘূর্নণ জনিত ও কম্পনজনিত গতি আছে । গ্যাসের অণুসমূহ সর্বদা বিক্ষিপ্ত গতিতে সকল দিকে ধাবমান অবস্থা থাকে । অনু সময়ের মধ্যে দুর্বল আন্তঃআণবিক শক্তি ও আন্তঃআণবিক শূন্যস্থান অধিক থাকায় গ্যাসীয় অবস্থার বৈশিষ্ট্য এই যে , গ্যাসের ঘনত্ব খুব কম এবং উহাদের সংকোচনশীলতা খুব বেশি ।

যেমন তরল পানির ঘনত্ব ১ গ্রাম/সি.সি . কিন্তু সিস্টেম ঘনত্ব ০.০০০৬গ্রাম/সি.সি । স্থির তাপমাত্রা চাপ দ্বিগুণ করিয়া গ্যাসের আয়তন প্রায় অর্ধেক হ্রাস করা যায় । কিন্তু দশগুণ চাপ বৃদ্ধি করলে ও তরলের আয়াতন অতি নগন্য পরিমাণের প্রবাহিত হয় এবং কঠিনের আয়তন এর উপর প্রভাব আরো অনেক কম হয় ।

গ্যাসের অণুসমূহ সর্বদাই বিক্ষিপ্ত গতিসম্পন্ন বলিয়া গ্যাসের কোন সীমাবদ্ধকারী তল নাই । সুতরাং গ্যাসের কোন নির্দিষ্ট আকার বা আয়তন নেই ।
উপরের আলোচনা হইতেই ইহা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে , গ্যাসের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য আছে । যথা – ১) গ্যাসণুসমূহের মধ্যে আন্তঃআণবিক আকর্ষণ শক্তি খুব কম এবং ২) গ্যাসাণুসমূহের মধ্যে আন্তঃআণবিক স্থান অনেক বেশি।
সংক্ষেপে বলা যায় যে , গ্যাসীয় অবস্থায় অনুগুলির মধ্যে পারস্পারিক ব্যবধান অর্থাৎ আন্তঃআণবিক স্থান অনেক বেশি । তরল বা কঠিন অবস্থায় এই আণবিক ব্যবধান অনেক কম । ইহা ছাড়াও গ্যাসীয় অবস্থায় নির্দিষ্ট পরিমাণ একটি বস্তুর অভ্যন্তরীণ শক্তির পরিমাণ উহার তরল বা কঠিন অবস্থার চাইতে অনেক বেশি । কিন্তু গ্যাসীয় অবস্থায় অনু সময়ের মধ্যে আকর্ষণ শক্তি উহার তরল বা কঠিন অবস্থান চাইতে অনেক কম ।

প্লাজমা অবস্থা :

পদার্থের সর্বোচ্চ শক্তি সম্বলিত অবস্থাকে প্লাজমা অবস্থা বলা হয় । প্লাজমা অবস্থায় কণাগুলো আধানযুক্ত হয় এবং প্রচন্ড গতিতে ছোটাছুটি করতে থাকে । সাধারণত \displaystyle 10^{4} -10^{5} \ ^{0} C তাপমাত্রা কিছু কিছু পদার্থ প্লাজমা অবস্থা থাকে । নিউক্লিয়াস ফিউশান গবেষণার ক্ষেত্রে , সূর্য ও নক্ষত্রমন্ডলীর পরিমণ্ডলে প্লাজমা অবস্থার উপস্থিতি জানা যায় ।

তরল স্ফটিকাকার অবস্থা :

কিছু কিছু স্ফটিকাকার কঠিন পদার্থ দেখা যায় যারা উত্তাপের স্বচ্ছ তরলে পরিণত হওয়ার পূর্বে কোন নির্দিষ্ট রূপান্তর বা অবস্থান তাপমাত্রা কঠিন ও তরল এর মাঝামাঝি গঠনের একটি অস্বচ্ছ তরলে রূপান্তরিত হয় । পদার্থের এই অবস্থাকে তরল স্ফটিক অবস্থা বলে । পদার্থের তরল স্ফটিক অবস্থা দুটি তাপমাত্রার ব্যবধানের অবস্থান করে গলন তাপমাত্রা ও স্বচ্ছকরণ তাপমাত্রা ।
কঠিন স্ফটিক \displaystyle \frac{গলন}{তাপমাত্রায়} তরল স্ফটিক ( অস্বচ্ছ ) \displaystyle \frac{স্বচ্ছকরণ}{তাপমাত্রা} স্বচ্ছতরল

তরল স্ফটিক অবস্থায় পদার্থ তরলের ধর্মের অনুরূপ প্রবাহ ধর্ম , পৃষ্ঠতল টান এবং স্ফটিকাকার কঠিনের মত কিছুমাত্রায় সুনির্দিষ্ট বিন্যাস , দৃড়তা ও আলোক ধর্ম প্রদর্শন করে । কোলেস্টেরলের বিভিন্ন জাতক কোলেস্টেরিক শ্রেনির উল্লেখযোগ্য তরল স্ফটিক গঠন করে ।

এছাড়াও বিশেষ ক্ষেত্রে আরো অনেক অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে ।

i) অ-চিরায়ত অবস্থা ( Non classical state )

ii) নিম্ন তাপমাত্রা অবস্থা ( Low Temperature state )

iii) উচ্চ শক্তি অবস্থা ( High Energy state )

iv) অন্যান্য প্রস্তারিত অবস্থা ( Other proposed state )

তরল স্ফটিক অবস্থার বৈশিষ্ট্য :

তরল স্ফটিক যৌগের গাঠনিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নে বর্ণনা করা হলো :-

i) এদের দীর্ঘ আণবিক কাঠামোর এক প্রান্ত পোলার গ্রুপ \displaystyle -CN,-NO,-NH_{2} ,-OR থাকে ।

ii) এদের অণুতে বেনজিন বলয়যুক্ত চ্যাপ্টা অংশ এবং দ্বিবন্ধন যুক্ত যেমন বিদ্যমান থাকে । যেমন:-
\displaystyle 4^{1} পেন্টাইল বাই ফিনাইল \displaystyle -4- কার্বোনাইট্রাইল

কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের ভৌত ধর্মের তুলনা :

কঠিন , তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের ভৌত ধর্মের তুলনা নিম্নে দেখানো হলো –

বৈশিষ্ট্য

i) আকার ও আকৃতিঃ

ii) আয়তনঃ

iii) ঘনত্বঃ

iv) সংকোচনশীলতাঃ

v) গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্কঃ

vi) গতিঃ

কঠিন :

i) কঠিন পদার্থের আকার ও আকৃতির নির্দিষ্ট ।

ii) আয়তন নির্দিষ্ট ।

iii) এদের ঘনত্ব খুব বেশি ।

iv) এরা সংকুচিত হয় না ।

v) গলনাংক ও খুব বেশি

vi) শুধু কম্পন গতি বিদ্যমান ।

তরল :

i) তরল পদার্থের আকার-আকৃতি নির্দিষ্ট নয় ।

ii) আয়তন নির্দিষ্ট ।

iii) এদের ঘনত্ব বেশি ।

iv) সামান্য সংকুচিত হয় ।

v) স্ফুটনাঙ্ক ও মাঝামাঝি ।

vi) এদের সব গতি বিদ্যমান তবে কম মাত্রায় ।

বায়বীয় :

i) গ্যাসীয় পদার্থের আকার ও আকৃতি অনির্দিষ্ট ।

ii) আয়তন অনির্দিষ্ট ।

iii) এদের ঘনত্ব কম ।

iv) খুবই সংকোচনশীল ।

v) স্ফুটনাংক খুবই কম ।

vi) সকল গতি অত্যাধিক ।

প্রশ্ন :

  • পদার্থ কি ? পদার্থের গঠন আলোচনা করো ।
  • পদার্থের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি সম্পর্কে আলোচনা করো ।
  • পদার্থের বিভিন্ন অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করো ।
  • কঠিন , তরল ও বায়বীয় পদার্থের বৈশিষ্ট্য সমূহ আলোচনা করো ।
  • প্লাজমা অবস্থা ও তরল স্ফটিক অবস্থা ব্যাখ্যা করো ।
  • তরল স্ফটিক অবস্থার বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো ।
  • পদার্থ কত প্রকার ও কি কি ব্যাখ্যা করো ।

Post Author: showrob

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

− 8 = 1